পুরাতন বাংলা সাহিত্যের যে ক’জন কবি সর্বকালের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সভায় স্থানলাভ করেছেন, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁদের অন্যতম।
 
মুকুন্দরাম মঙ্গল কাব্যের কবি (‘মঙ্গল কাব্য’ শব্দটি আধুনিক, দীনেশচন্দ্র সেনের সৃষ্টি বলে মনে হয়)। এই কাব্যের ধারায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদিত। মুকুন্দরাম সম্ভবত একাধিক কাব্য লিখেছিলেন, তার মধ্যে একটিই এখন পাওয়া যায়, এটি হ’ল তার ‘চণ্ডীমঙ্গল’—যা সাধারণের কাছে ‘কবিকঙ্কণ-চণ্ডী’ নামে পরিচিত।
 
  1.  
 
‘কবিকঙ্কণ-চণ্ডী’ নামটি সম্ভবত কবিরই দেওয়া। এই ধারণার সমর্থন মেলে নিম্নোদ্ধৃত ভণিতা থেকে,
 
“মহামিশ্র জগন্নাথ
হৃদয় মিশ্রের তাত
কবিচন্দ্র হৃদয়নন্দন।
তাহার অনুজ ভাই
চণ্ডীর আদেশ পাই
বিরচিল শ্ৰীকবিকঙ্কণ ॥”
 
যেমন রামপ্রসাদের উপাধি ছিল ‘কবিরঞ্জন’, আবার তার “বিদ্যাসুন্দর”-এর নামও ছিল ‘কবিরঞ্জন’, তেমনি মুকুন্দরামেরও নিজের উপাধি এবং বইয়ের নাম দুইই ‘কবিকঙ্কণ’ ছিল বলে মনে হয়।
 
কবির পিতৃদত্ত নাম কী ছিল, তা নিয়ে সাম্প্রতিক কালে কিছু বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ড. সুকুমার সেন বলেন, যেহেতু কাব্যের ভণিতায় ‘মুকুন্দরাম’ নাম নেই, ‘মুকুন্দ’ আছে— অতএব কবির নাম ‘মুকুন্দরাম’ ছিল না। ড. সেন ও তাঁর অনুবর্তীরা কবিকে ‘কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী’ বলেই অভিহিত করেছেন।
 
ড. সেনের যুক্তি গুরুত্বহীন না হলেও কবির নাম যে আদৌ ‘মুকুন্দরাম’ ছিল না, তা বলা যায় না। কেবল ভণিতার সাক্ষ্য বিচার করলে বলতে হয়, ভারতচন্দ্রের নাম ছিল ‘ভারত’। কিন্তু, অন্য প্রমাণ থেকে আমরা জানি যে তার নাম ছিল ‘ভারতচন্দ্র’। কবিকঙ্কণের ক্ষেত্রেও ঐ জাতীয় “অন্য প্রমাণ” আছে কিনা, তা দেখতে হবে।
 
সম্প্রতি ড. রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় তাঁর এক ভাষণে বলেছেন যে কবির নাম ‘মুকুন্দরাম’ ছিল না, যেহেতু ষোড়শ শতাব্দীর বাঙালীদের মধ্যে মধ্যপদযুক্ত নাম থাকার প্রমাণ মেলে না।। প্রমাণ যথেষ্টই মেলে, আমরা কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি,
 
(১) চন্দ্রশেখর আচার্য (চৈতন্যদেবের মেশো), (২) কমলাকান্ত বিশ্বাস (অদ্বৈতের ম্যানেজার), (৩) পরমানন্দদাস সেন (যিনি ‘কবিকর্ণপুর’ নামে বিখ্যাত), (৪) গোবিন্দদাস সেন (যিনি পরবর্তী জীবনে ‘কবিরাজ’ উপাধি পেয়ে ‘গোবিন্দদাস কবিরাজ’ নামে পরিচিত হন)।
 
এঁরা সবাই ষোড়শ শতাব্দীর লোক এবং মধ্যপদযুক্ত নামের অধিকারী। আসল কথা, বাঙালীদের মধ্যপদযুক্ত নাম বরাবরই ছিল—কিন্তু উল্লেখের সময়ে তাঁরা মধ্যপদকে উহ্য রেখে দিতেন; এই অভ্যাস আধুনিক কালের বাঙালীদের মধ্যেও দেখা যায়– বঙ্কিম চাটুজ্যে, শরৎ চাটুজ্যে, রবি ঠাকুর, কাশী মিত্তিরের ঘাট প্রভৃতি কয়েকটি সুপরিচিত দৃষ্টান্ত দিলাম।
 
যা হোক, কবিকঙ্কণের প্রকৃত নাম যে ‘মুকুন্দরাম’ ছিল, তার প্রমাণ আছে। সে প্রমাণ এই–
 
মাণিকরাম গাঙ্গুলী তার ধর্মমঙ্গলে সুরিক্ষার পাটে বন্দী নাগরদের তালিকায় তার পূর্ববর্তী বিশিষ্ট কবিদের নাম দিয়েছেন– তার মধ্যে কৃত্তিবাস, নরোত্তম, নিধিরাম, খেলারাম, গোবিন্দ, কৃষ্ণদাস, কাশীরাম, ঘনরাম চণ্ডীদাস, নরহরি, নিত্যানন্দ প্রমুখ কবিদের নামের সঙ্গে ‘মুকুন্দরাম’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। কবিকল্পণ-চন্ডীর প্রথম মুদ্রিত সংস্করণগুলির প্রকাশকেরাও লিখেছিলেন যে কবির নাম ছিল ‘মুকুন্দরাম’। তারা নিশ্চয়ই প্রায় অজ্ঞাত মাণিকরামের ধর্মমঙ্গল থেকে এই সংবাদ সংগ্রহ করেন নি, তাদের সংগ্রহের উৎস ভিন্ন। সুতরাং দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সূত্র থেকে কবির ‘মুকুন্দরাম’ নাম থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমরা এই কবিকে ‘মুকুন্দরাম’ বলেই অভিহিত করব।
 
 
[ads id=”ads2″]
 
 
 
 
লেখা : সুখময় মুখোপাধ্যায়

আরো পড়ুন :  শিক্ষাষ্টক / শিক্ষাশ্লোকাষ্টক [শ্রীচৈতন্যদেব]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *