পটচিত্র

বাংলার পটচিত্র: ইতিহাস, নান্দনিকতা এবং আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের একটি সামগ্রিক সমীক্ষা


পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতির বিশাল ক্যানভাসে ‘পটচিত্র’ বা ‘পটশিল্প’ এক অনন্য এবং স্বকীয় স্থান দখল করে আছে। সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বাংলার পটচিত্র কেবল একটি চিত্রকলা নয়, বরং এটি একটি প্রাচীন শ্রবণ-দর্শন মাধ্যম (Audio-Visual Medium)। সংস্কৃত শব্দ ‘পট্ট’ (বস্ত্র) এবং ‘চিত্র’ (ছবি) থেকে উদ্ভূত এই শিল্পকর্মের মূল আভিধানিক অর্থ কাপড়ের ওপর অঙ্কিত চিত্র ।

বাংলার পটচিত্র: ইতিহাস, নান্দনিকতা এবং আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের একটি সামগ্রিক সমীক্ষা

১. ভূমিকা: বাংলার লৌকিক ঐতিহ্যের অডিও-ভিজ্যুয়াল দলিল

পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতির বিশাল ক্যানভাসে ‘পটচিত্র’ বা ‘পটশিল্প’ এক অনন্য এবং স্বকীয় স্থান দখল করে আছে। সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বাংলার পটচিত্র কেবল একটি চিত্রকলা নয়, বরং এটি একটি প্রাচীন শ্রবণ-দর্শন মাধ্যম (Audio-Visual Medium)। সংস্কৃত শব্দ ‘পট্ট’ (বস্ত্র) এবং ‘চিত্র’ (ছবি) থেকে উদ্ভূত এই শিল্পকর্মের মূল আভিধানিক অর্থ কাপড়ের ওপর অঙ্কিত চিত্র । কিন্তু এই সাধারণ সংজ্ঞা বাংলার পটচিত্রের অন্তর্নিহিত গভীরতা ও সামাজিক গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ। ওড়িশার পটচিত্রের সঙ্গে নামগত ও গঠনগত মিল থাকলেও, বাংলার পটচিত্র—বিশেষ করে ‘জড়ানো পট’—তার পরিবেশনা রীতির জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এখানে চিত্রকর কেবল তুলি ধরেন না, তিনি তার অঙ্কিত আখ্যানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গানও পরিবেশন করেন, যা ‘পটের গান’ নামে পরিচিত ।

প্রাচীন বঙ্গদেশের গ্রামীণ বিনোদন, নীতিশিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রচারের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই পটচিত্র। এটি এমন এক শিল্পধারা যেখানে দৃশ্যকলা এবং মৌখিক সাহিত্য (Oral Literature) একীভূত হয়েছে। বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদ এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের (বিশেষত পিংলা ব্লকের নয়া গ্রাম) গ্রামীণ জনজীবনের সঙ্গে এই শিল্প অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত । ২০১৮ সালে ‘বাংলার পটচিত্র’ তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (GI) বা ভৌগোলিক নির্দেশক তকমা লাভ করে, যা একে ওড়িশার পটচিত্র থেকে আইনত এবং শৈল্পিক দিক থেকে পৃথক মর্যাদা দান করেছে ।

এখানে বাংলার পটচিত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, এর উপাদান ও রাসায়নিক গঠন, পটুয়া সম্প্রদায়ের বিচিত্র সমাজতাত্ত্বিক অবস্থান, পটের গানের সাহিত্যমূল্য এবং সমসাময়িক বিশ্বায়নের যুগে এর টিকে থাকার লড়াই ও রূপান্তরের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিবর্তন

২.১ বৌদ্ধ উৎস ও প্রাচীনত্ব

বাংলার পটচিত্রের উৎস সন্ধান করতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাক-পাল যুগে। ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, এই শিল্পধারার আদি রূপটি বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল । প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং পরিব্রাজকরা গৌতম বুদ্ধের জীবনী, জাতকের গল্প এবং বৌদ্ধ দর্শনের মূলবাণী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য চিত্রিত স্ক্রোল বা পট ব্যবহার করতেন। যেহেতু তৎকালীন সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ নিরক্ষর ছিল, তাই এই দৃশ্যমান মাধ্যমটি ধর্মপ্রচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করত । এই অর্থে, পটুয়ারা ছিলেন বাংলার আদিমতম ‘ভিজ্যুয়াল জার্নালিস্ট’ বা দৃশ্য-সাংবাদিক।

সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে হর্ষবর্ধনের রাজত্বকাল এবং পরবর্তীকালে পাল যুগের শুরুর দিকে বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ এবং বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষস’ নাটকে ‘যমপট’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই যমপটে পরকালের দৃশ্য এবং পাপ-পুণ্যের বিচার চিত্রিত থাকত, যা ভিক্ষু বা চারণকবিরা প্রদর্শন করতেন । সুতরাং, এটি নিশ্চিত যে একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীর বহু পূর্বেই বাংলায় পটচিত্রের একটি সুসংহত ধারা বিদ্যমান ছিল।

২.২ হিন্দু পুনজাগরণ ও বিষয়বস্তুর পরিবর্তন

অষ্টম শতাব্দীর পর থেকে যখন বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করে এবং হিন্দু ধর্মের পুনজাগরণ ঘটে, তখন পটচিত্রের বিষয়বস্তুতেও এক আমূল পরিবর্তন আসে। বৌদ্ধ আখ্যানের স্থান দখল করে নেয় রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী। বিশেষত, চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলনের প্রভাবে কৃষ্ণলীলা এবং বৈষ্ণবীয় আখ্যান পটের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে ।

এর পাশাপাশি, মধ্যযুগের বাংলায় লৌকিক দেবদেবীদের উত্থান পটচিত্রের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করে। মঙ্গলকাব্য সাহিত্যের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মনসামঙ্গল (মনসা দেবীর কাহিনী), চণ্ডীমঙ্গল এবং ধর্মঠাকুরের কাহিনী পটের মাধ্যমে গীত ও প্রদর্শিত হতে থাকে। এই সময় থেকেই পটচিত্র কেবল ধর্মীয় উপাচারের সামগ্রী না হয়ে, গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎসে পরিণত হয় ।

২.৩ পটুয়া সমাজ ও ইসলামি প্রভাব

বাংলার পটচিত্রের ইতিহাসে ত্রয়োদশ শতাব্দীর পরবর্তী সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তুর্কি আক্রমণের পর এবং সুফি সাধকদের আগমনের ফলে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় ইসলামের প্রসার ঘটে। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ পটুয়া সম্প্রদায়ের ওপরও লাগে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই শিল্পীরা ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেও, তাদের পেশাগত ঐতিহ্য অর্থাৎ হিন্দু দেবদেবীর চিত্রাঙ্কন ও গান গাওয়া ত্যাগ করেননি। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক অনন্য ধর্মীয় সমন্বয়বাদ বা ‘Syncretism’ ।

পটুয়ারা তাদের পটে যেমন রাম-সীতা বা রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী স্থান দিয়েছেন, তেমনি ‘গাজীর পট’-এ পীর-ফকিরদের অলৌকিক মাহাত্ম্যও বর্ণনা করেছেন। সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকায় দক্ষিণ রায় ও বনবিবির কাহিনী বা গাজীর পটের প্রচলন এই হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন ।

৩. পটের শ্রেণিবিভাগ ও গঠনশৈলী

বাংলার পটচিত্রকে গঠন, আকার এবং ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ‘জড়ানো পট’ (Scroll Painting) এবং ‘চৌকো পট’ (Square/Rectangular Painting)। এছাড়াও, ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ‘চালচিত্র’, ‘দুর্গাপট’ ইত্যাদি বিশেষায়িত রূপভেদ রয়েছে।

৩.১ জড়ানো পট: আখ্যানের প্রবাহ

বাংলার পটচিত্রের সবচেয়ে ধ্রুপদী এবং পরিচিত রূপ হলো জড়ানো পট। এটি মূলত একটি দীর্ঘ কাগজ বা কাপড়ের ফালি, যা লম্বায় ১০ থেকে ১৫ ফুট বা তারও বেশি হতে পারে।

  • গঠন: এই পটগুলি একাধিক ফ্রেমে বা প্যানেলে বিভক্ত থাকে। প্রতিটি প্যানেলে গল্পের একেকটি পর্ব চিত্রিত হয়। পটুয়া গান গাওয়ার সময় ওপর থেকে নিচের দিকে ধীরে ধীরে পটটি খুলতে থাকেন, যাকে বলা হয় ‘পট খেলানো’ ।
  • বিষয়বস্তু: জড়ানো পটে সাধারণত দীর্ঘ আখ্যানমূলক কাহিনী যেমন রামায়ণ (লঙ্কাকাণ্ড, সিনধুবধ), কৃষ্ণলীলা, সাবিত্রী-সত্যবান, বেহুলা-লখিন্দর ইত্যাদি স্থান পায়। সাম্প্রতিককালে সুনামি, ৯/১১-এর হামলা, বা করোনা মহামারীর মতো ঘটনাও এই দীর্ঘ পটে উঠে এসেছে ।
  • উপ-শ্রেণি: জড়ানো পটের মধ্যে ‘দীঘল পট’ (সবচেয়ে দীর্ঘ), ‘আড়েলাটাই পট’ ইত্যাদি উপবিভাগ রয়েছে।
আরো পড়ুন :  কল্কা (কলকা) নকশা

৩.২ চৌকো পট: একক মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি

জড়ানো পটের মতো ধারাবাহিক আখ্যান না থাকলেও, চৌকো পটে একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত বা দেবদেবীর রূপ একক ফ্রেমে ধরা দেয়।

  • কালীঘাট পট: উনিশ শতকের কলকাতায় কালীঘাট মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে নাগরিক পটচিত্রের ধারা গড়ে উঠেছিল, তা মূলত চৌকো পটেরই একটি বিবর্তিত রূপ। দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে সহজলভ্য এই পটে বাবু কালচারের ব্যঙ্গচিত্র, কেলেঙ্কারির ঘটনা (যেমন তারকেশ্বর মহন্তের কেলেঙ্কারি) এবং ধর্মীয় আইকনরা স্থান পেত। পরবর্তীকালে যামিনী রায় এই শৈলী দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন ।
  • যমপট ও জাদুপট: পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকায় এক বিশেষ ধরণের চৌকো পট দেখা যায়, যা ‘জাদুপট’ নামে পরিচিত। এখানে মৃতের পারলৌকিক ক্রিয়ার অংশ হিসেবে ‘চক্ষুদান’ পট অঙ্কন করা হয়। সাঁওতাল বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পটের মাধ্যমে মৃতের আত্মা শান্তি পায় ।

৩.৩ চালচিত্র: দেবীর অলঙ্কার

বাংলার দুর্গাপূজার প্রতিমার পেছনে যে অর্ধবৃত্তাকার চালি বা পটভূমি থাকে, তাকেই ‘চালচিত্র’ বলা হয়। এটি বাংলার পটচিত্রের এক অতি বিশেষায়িত এবং সাবেকি রূপ।

  • তাৎপর্য: ‘চালচিত্র’ শব্দের অর্থ ‘চাল’ বা আচ্ছাদনের চিত্র। এটি কেবল অলঙ্করণ নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ পৌরাণিক আখ্যান। সাবেকিয়ানা মেনে কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি বা অন্যান্য বুনিয়াদি পরিবারের পূজায় আজও হাতে আঁকা চালচিত্র ব্যবহৃত হয় ।
  • বিষয়বস্তু: চালচিত্রে সাধারণত মহাদেব বা শিবকে কেন্দ্র করে দশমহাবিদ্যা, বিষ্ণুর দশাবতার, রাধা-কৃষ্ণ, রাম-সীতা এবং মহিষাসুরমর্দিনীর যুদ্ধের দৃশ্য আঁকা হয়। এটি প্রতিমার পেছনের শূন্যস্থান পূরণ করে একটি ‘ঐশ্বরিক মণ্ডল’ তৈরি করে ।
  • প্রকারভেদ: কাঠামোর আকৃতি অনুযায়ী চালচিত্রের বিভিন্ন নাম রয়েছে, যেমন—বাংলা চালি, মার্কিনি চালি, টানাচৌরি চালি, মঠচৌরি চালি ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘বাংলা চালি’ মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে তৈরি হয় এবং এটি দুই পাশে প্রসারিত থাকে ।

৩.৪ দুর্গাপট ও সরাচিত্র

বীরভূম, বাঁকুড়া এবং বর্ধমানের কিছু অঞ্চলে মৃন্ময়ী মূর্তির পরিবর্তে পটে আঁকা দুর্গার পূজা করার প্রচলন রয়েছে। একে বলা হয় ‘দুর্গাপট’ বা ‘দুর্গা সরা’। বিশেষত হাটসেরান্দি সূত্রধর সমাজে এই দুর্গাপটের বিশেষ কদর রয়েছে। মাটির সরা বা থালার ওপর দুর্গা ও তার পরিবারকে অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙে আঁকা হয় এবং তান্ত্রিক মতে পূজা করা হয় ।

৪. উপকরণ ও নির্মাণশৈলী: রসায়ন ও প্রকৃতি

বাংলার পটচিত্রের স্থায়িত্ব এবং এর রঙের ঔজ্জ্বল্য সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক সিন্থেটিক রঙের যুগেও পিংলার শিল্পীরা এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি ধরে রেখেছেন, যা এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

৪.১ পট্ট বা ক্যানভাস প্রস্তুতি

প্রাচীনকালে পট আঁকা হতো কাপড়ের ওপর। বর্তমানে মূলত কাগজের ওপর আঁকা হয়, তবে কাগজের স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য এর পেছনে পুরনো শাড়ির কাপড় বা ছেঁড়া নেকড়া আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়।

  • পদ্ধতি: কাগজ ও কাপড়ের এই স্তরগুলিকে জোড়া লাগানোর জন্য তেঁতুল বিচি (Tamarind seed) সেদ্ধ করে তৈরি আঠা এবং চক পাউডার বা মাটি মেশানো হয়। এই প্রলেপ শুকিয়ে গেলে পাথর দিয়ে ঘষে (Burnishing) মসৃণ করা হয়, যাকে বলা হয় ‘পটি’ বা ‘নি‍য়ারা’। এই মসৃণ পৃষ্ঠেই রঙ চাপানো হয় ।

৪.২ প্রাকৃতিক রঙের উৎস ও প্রস্তুত প্রণালী

পটুয়ারা তাদের রঙ বা ‘রং’ নিজেরাই তৈরি করেন। প্রতিটি রঙের উৎস পরিবেশের সহজলভ্য উপাদান।

রঙের নামপ্রাকৃতিক উৎসপ্রস্তুতির বিবরণ
হলুদকাঁচা হলুদ বা হরিতাল পাথরহলুদের মূল বেটে রস বের করা হয়। হরিতাল পাথর ঘষেও উজ্জ্বল হলুদ পাওয়া যায় ।
নীলঅপরাজিতা ফুল বা নীল গাছ (Indigo)অপরাজিতা ফুলের পাপড়ি চটকে বা নীল গাছের নির্যাস থেকে তৈরি হয় ।
কালোভুষকালি (Soot)তেলের প্রদীপ বা লন্ঠনের শিখার ওপর মাটির সরা ধরে যে কালি জমে, তা সংগ্রহ করা হয়। অনেক সময় চাল ভাজাও ব্যবহার করা হয় ।
লালগেরিমাটি (Red Ochre) বা সিঁদুরলাল মাটি বা গেরু পাথর ঘষে লাল রঙ তৈরি হয়। পান খাওয়ার খয়ের থেকেও লাল আভা আনা হয় ।
সাদাশঙ্খ চূর্ণ বা খড়িমাটি (Chalk)শঙ্খ বা শামুকের খোলস পুড়িয়ে গুঁড়ো করে এবং খড়িমাটি ভিজিয়ে সাদা রঙ তৈরি হয় ।
সবুজসিম পাতা বা নীল ও হলুদের মিশ্রণসিম গাছের পাতা বা অন্যান্য সবুজ লতাপাতা থেকে রস নিংড়ে সবুজ রঙ পাওয়া যায় ।

আঠা বা বাইন্ডার: প্রাকৃতিক রঙ যাতে ঝরে না যায়, তার জন্য রঙের সঙ্গে বেল (Wood apple) বা তেঁতুল বিচির আঠা মেশানো হয়। নারকেলের মালায় (Coconut shell) এই রঙ সংরক্ষণ করা হয় ।

৪.৩ তুলি বা ব্রাশ

পটুয়ারা তাদের তুলিও নিজেরাই তৈরি করেন। বাঁশের কঞ্চির আগায় ছাগলের লোম বা কাঠবিড়ালির লেজের লোম বেঁধে সূক্ষ্ম কাজের তুলি তৈরি করা হয়। মোটা কাজের জন্য কখনও কখনও পাটের আঁশও ব্যবহার করা হয় ।

৫. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও শৈলী

যদিও ‘বাংলার পট’ একটি সামগ্রিক পরিভাষা, তথাপি জেলাভেদে এর শৈলী বা স্টাইলের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

৫.১ মেদিনীপুর শৈলী (পিংলা/নয়া)

পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা ব্লকের নয়া গ্রাম বর্তমানে পটচিত্রের প্রধান কেন্দ্র। এখানকার পটের বৈশিষ্ট্য হলো বলিষ্ঠ রেখাঙ্কন এবং ঘন সন্নিবিষ্ট কম্পোজিশন। এখানকার শিল্পীরা সামাজিক বিষয় নিয়ে প্রচুর কাজ করেন এবং তাদের রঙের ব্যবহার অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বৈচিত্র্যময় ।

৫.২ বীরভূম শৈলী

বীরভূমের পটে লাল, কালো এবং মেটে বা গেরুয়া রঙের প্রাধান্য বেশি দেখা যায়। এখানকার পটের প্রেক্ষাপটে বা ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রায়শই ‘ইন্ডিয়ান রেড’ বা গাঢ় লাল রঙ ব্যবহার করা হয়। বীরভূমের পটুয়ারা ‘চক্ষুদান’ পট এবং ‘যমপট’-এর জন্য বিখ্যাত। এখানকার রেখাচিত্রগুলি তুলনামূলকভাবে সরল কিন্তু ভাবপ্রকাশে অত্যন্ত শক্তিশালী ।

আরো পড়ুন :  বাংলার আলপনা: সেকাল ও একাল — একটি পূর্ণাঙ্গ নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক সমীক্ষা

৫.৩ বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া শৈলী

এই অঞ্চলের পটে আদিবাসী বা ট্রাইবাল আর্টের প্রভাব স্পষ্ট। একে অনেক সময় ‘সাঁওতাল পট’ বলা হয়। এখানে মানুষের অবয়ব অঙ্কনে জ্যামিতিক আকার এবং সরলীকরণ লক্ষ্য করা যায়। রঙ হিসেবে পোড়া সienna (Burnt Sienna) এবং হলুদের ব্যবহার বেশি। এখানকার বিষয়বস্তুর মধ্যে সাঁওতাল সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবন প্রধান ।

৫.৪ ওড়িশা বনাম বাংলা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

অনেকে ওড়িশার পট্টচিত্রের সঙ্গে বাংলার পটকে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

বৈশিষ্ট্যবাংলার পটচিত্রওড়িশার পট্টচিত্র
উদ্দেশ্যমূলত অডিও-ভিজ্যুয়াল পরিবেশনা (গানের সঙ্গে প্রদর্শন)।মূলত ধর্মীয় উপাসনা ও স্মারক (Souvenir) হিসেবে ব্যবহৃত।
শৈলীরেখাগুলি মুক্ত এবং প্রবহমান (Free-flowing)। লোকশিল্পের প্রভাব বেশি।অত্যন্ত সূক্ষ্ম, অলঙ্কৃত এবং শাস্ত্রীয় (Classical) শৈলী। মিনিয়েচার আর্টের প্রভাব।
বর্ডার বা পাড়সাধারণত পটের চারপাশের বর্ডার সরল হয় বা থাকে না।প্রতিটি ছবির চারপাশে অত্যন্ত জটিল ও নকশাদার বর্ডার থাকে।
পরিবেশনাপটের গান আবশ্যিক।গানের প্রচলন নেই, এটি কেবলই দৃশ্যকলা ।

৬. পটের গান: মৌখিক সাহিত্যের অনন্য দলিল

বাংলার পটচিত্রের আত্মা হলো ‘পটের গান’। পটুয়ারা যখন পট প্রদর্শন করেন, তখন তারা হাতে আঁকা ছবিগুলোর ব্যাখ্যা দেন গানের মাধ্যমে। এই গানগুলো পটুয়ারা নিজেরাই রচনা করেন এবং বংশপরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে।

৬.১ গানের গঠন

পটের গানের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে, যা সাধারণত তিনটি অংশে বিভক্ত: ১. কাহিনী: মূল গল্পের বর্ণনা। এখানে পৌরাণিক বা সামাজিক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থাকে। ২. মাহাত্ম্য: যে দেবতা বা বিষয়ের ওপর পটটি আঁকা হয়েছে, তার গুণকীর্তন বা নৈতিক শিক্ষার অংশ। ৩. ভণিতা: গানের শেষ অংশ, যেখানে পটুয়া নিজের নাম, গ্রামের নাম এবং কখনও কখনও থানার নাম উল্লেখ করেন। এটি শিল্পীর ‘কপিরাইট’ বা স্বত্ব হিসেবে কাজ করে ।

৬.২ লিরিক্স বা গানের কথা: পৌরাণিক ও সামাজিক

পটের গানের ভাষা সহজ-সরল গ্রাম্য বাংলা, কিন্তু তার আবেগের গভীরতা অসীম। নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

উদাহরণ ১: সাবিত্রী-সত্যবান (পৌরাণিক পট)

“যুধিষ্ঠির বলেন শুন মার্কণ্ড্য মহামুনি সাবিত্রী সত্যবান কথা বল শুনি অশ্বপতি নামে রাজা অবন্তীর পতি শত্রু নিলো রাজ্য কেড়ে বনে করেন বসতি…”

এই গানে মহাভারতের বনপর্বের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যেখানে সাবিত্রী তার স্বামী সত্যবানকে যমের হাত থেকে ফিরিয়ে আনছেন।

উদাহরণ ২: ফরাসি বিপ্লব (আধুনিক/ঐতিহাসিক পট) আশ্চর্যজনকভাবে, বাংলার পটুয়ারা ফরাসি বিপ্লবের মতো আন্তর্জাতিক ঘটনাকেও তাদের পটে স্থান দিয়েছেন। এটি তাদের বিশ্ববীক্ষার প্রমাণ দেয়।

“শুনুন বলি ফরাসি দেশের কথা রাজা প্রজার দ্বন্দ্বে গেল কত জনার মাথা…”

উদাহরণ ৩: চণ্ডীমঙ্গল (কমলে-কামিনী) চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের ধনপতি সদাগরের কাহিনী পটের গানে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

“ওরে বাছা শ্রীমন্ত সদাগর মশানেতে লয়ে যায় তোমারে…”

৬.৩ গানের রূপান্তর

বর্তমানে গানের সুরে বৈচিত্র্য এসেছে। পুরনো কীর্তন বা জারি গানের সুরের পাশাপাশি এখন আধুনিক বাউলের সুরও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে বিষয়বস্তুতে। পটুয়ারা এখন কেবল পুরাণ নয়, সমসাময়িক সংবাদ পরিবেশন করছেন গানের মাধ্যমে ।

৭. পটুয়া সমাজ: ধর্মীয় সমন্বয়বাদ ও আত্মপরিচয়

পটুয়া বা চিত্রকর সম্প্রদায় বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত দলিল। তাদের জীবনযাত্রা এবং ধর্মবিশ্বাস হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ।

৭.১ দ্বৈত সত্তা

অধিকাংশ পটুয়া মুসলিম ধর্মাবলম্বী, তারা নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন এবং ইসলামী রীতিতে বিবাহ ও দাফন সম্পন্ন করেন। কিন্তু তাদের পেশাগত জীবন হিন্দু পুরাণ নির্ভর। তাই সামাজিকভাবে তাদের দুটি নাম থাকে—একটি মুসলিম নাম (যেমন: আনোয়ার, রউফ) এবং একটি হিন্দু নাম বা ‘ডাকনাম’ (যেমন: শম্ভু, মন্টু)। তবে বর্তমানে অনেক শিল্পী (যেমন স্বর্ণ চিত্রকর, মনু চিত্রকর) তাদের একটি নামেই পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ।

৭.২ পদবী ও জাতিসত্তা

পটুয়ারা সাধারণত ‘চিত্রকর’ পদবী ব্যবহার করেন। অতীতে রক্ষণশীল হিন্দু বা মুসলিম—উভয় সমাজই তাদের কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখত। হিন্দুরা তাদের ‘জাত-হীন’ মনে করত, আর মুসলিমরা তাদের ‘মূর্তি-রচয়িতা’ বা ‘পৌত্তলিক’ ভাবত। এই সামাজিক বঞ্চনা থেকেই তারা নিজেদের মধ্যে এক নিবিড় ও স্বতন্ত্র কৃষ্টি গড়ে তুলেছে, যেখানে শিল্পই তাদের প্রধান ধর্ম ।

৮. বিষয়বস্তুর বিবর্তন: পুরাণ থেকে ভিজ্যুয়াল জার্নালিজম

বাংলার পটচিত্রের টিকে থাকার মূল রহস্য হলো এর অভিযোজন ক্ষমতা (Adaptability)। সময় বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পটুয়ারা তাদের তুলি ও সুরকে নতুন সময়ের উপযোগী করে তুলেছেন।

৮.১ ঐতিহ্যবাহী বিষয়

ঐতিহ্যগতভাবে পটের বিষয় ছিল রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, গৌরাঙ্গলীলা এবং মঙ্গলকাব্যের গল্প। যমপটে মৃত্যুর পর পাপীদের শাস্তির ভয়াবহ দৃশ্য এঁকে গ্রামের মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হতো। গাজীর পটে পীরসাহেবদের বাঘের পিঠে চড়ে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের দৃশ্য থাকত ।

৮.২ সমসাময়িক পট বা ‘Visual Journalism’

বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে পটুয়ারা সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাকে পটে স্থান দিতে শুরু করেন। একে গবেষকরা ‘ফোক ভিজ্যুয়াল জার্নালিজম’ বলে অভিহিত করেছেন ।

  • ৯/১১ এবং সন্ত্রাসবাদ: ২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা পটুয়ারা তাদের পটে এঁকেছেন। সেখানে ওসামা বিন লাদেন এবং জর্জ বুশকে দেখা যায়, এবং গানের মাধ্যমে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া হয় ।
  • সুনামি: ২০০৪ সালের সুনামির ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস এবং ধ্বংসলীলা পটের বিষয় হয়েছে।
  • সামাজিক সচেতনতা: পণপ্রথা, নারী পাচার, এইডস (HIV/AIDS) সচেতনতা, বৃক্ষরোপণ এবং সাক্ষরতা অভিযানের প্রচারে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো পটচিত্রকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। স্বর্ণ চিত্রকর নারী পাচার ও কন্যাভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে পট এঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন ।
  • করোনা মহামারী: সাম্প্রতিককালে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসকে পটুয়ারা এক আধুনিক ‘অসুর’ হিসেবে কল্পনা করেছেন। পটে দেখা যায় করোনা-রূপী রাক্ষস মানুষকে আক্রমণ করছে, আর ডাক্তার ও পুলিশরা দেবতার মতো ঢাল হয়ে তাকে প্রতিহত করছে। মাস্ক পরা এবং হাত ধোয়ার বার্তা গানের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ।
আরো পড়ুন :  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য : প্রবাদ-প্রবচন

৯. বর্তমান অবস্থা, অর্থনীতি এবং উৎসব

একসময় যে শিল্পীরা ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, আজ তারা আন্তর্জাতিক শিল্পী হিসেবে স্বীকৃত। এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে মেদিনীপুরের পিংলা ব্লকের ‘নয়া’ গ্রামের উত্থান।

৯.১ নয়া গ্রাম: পটের রাজধানী

নয়া গ্রাম বর্তমানে বাংলার পটচিত্রের প্রধান হাব বা কেন্দ্র। এখানে প্রায় ২৫০ জন পটুয়া বাস করেন। গ্রামের প্রতিটি মাটির বাড়ির দেওয়াল পটের ছবিতে চিত্রিত, যা গ্রামটিকে একটি ‘ওপেন এয়ার মিউজিয়াম’ বা মুক্ত জাদুঘরে পরিণত করেছে ।

৯.২ পটমায়া উৎসব (Pot Maya Festival)

২০১০ সাল থেকে ‘বাংলা নাটক ডট কম’ (Banglanatak dot com)-এর সহযোগিতায় নয়া গ্রামে প্রতি বছর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে (সাধারণত ৩ দিন ব্যাপী) ‘পটমায়া’ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

  • উদ্দেশ্য: মধ্যস্বত্বভোগীদের (Middlemen) দৌরাত্ম্য কমিয়ে শিল্পীদের সঙ্গে ক্রেতা ও পর্যটকদের সরাসরি সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া।
  • কার্যক্রম: উৎসবে পর্যটকরা সরাসরি শিল্পীদের ঘরে গিয়ে পট কেনেন, গান শোনেন এবং প্রাকৃতিক রঙ তৈরির কর্মশালায় অংশ নেন। এই উৎসব পটুয়াদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন এনে দিয়েছে ।

৯.৩ সরকারি উদ্যোগ ও স্বীকৃতি

পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ইউনেস্কোর (UNESCO) যৌথ উদ্যোগে ‘রুরাল ক্রাফট হাব’ (Rural Craft Hub) প্রকল্পের মাধ্যমে পটচিত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে।

  • ভৌগোলিক নির্দেশক (GI Tag): ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ‘বাংলার পটচিত্র’ জিআই ট্যাগ লাভ করে। এর ফলে এই শিল্পের স্বকীয়তা এবং বাণিজ্যিক অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে ।
  • লোক প্রসার প্রকল্প: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘লোক প্রসার প্রকল্প’-এর আওতায় ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী শিল্পীরা মাসিক ১০০০ টাকা রিটেইনার ফি বা ভাতা পান। এছাড়াও ষাটোর্ধ্ব শিল্পীরা পেনশন পান। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের প্রচারে অংশগ্রহণের জন্য তাদের পারফরম্যান্স ফি দেওয়া হয়। এই আর্থিক নিরাপত্তা শিল্পীদের পেশায় টিকে থাকতে সাহায্য করেছে ।

১০. চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এত সাফল্য সত্ত্বেও বাংলার পটচিত্রের সামনে কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

১০.১ গানের বিলুপ্তি

পটচিত্রের মূল আকর্ষণ ছিল তার গান। কিন্তু বর্তমানে বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ‘অডিও-ভিজ্যুয়াল’ মাধ্যমটি কেবল ‘ভিজ্যুয়াল’ আর্টে পরিণত হচ্ছে। পর্যটকরা ঘর সাজানোর জন্য চৌকো পট কিনছেন, কিন্তু গানের সিডি কিনছেন না বা শোনার সময় পাচ্ছেন না। ফলে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা ছবি আঁকায় দক্ষ হলেও গান রচনায় বা গাওয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। এটি এই শিল্পের মৌলিকত্বের প্রতি এক বড় হুমকি ।

১০.২ বাণিজ্যিকীকরণ ও মানের অবক্ষয়

চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উৎপাদনের চাপ বেড়েছে। অনেকে প্রাকৃতিক রঙের বদলে কৃত্রিম বা পোস্টার কালার ব্যবহার করার প্রলোভনে পড়ছেন। টি-শার্ট, কেটলি বা কোস্টারের ওপর পট আঁকার ফলে এটি তার আখ্যানধর্মী চরিত্র (Narrative Character) হারিয়ে ফেলছে ।

১০.৩ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা

যদিও স্বর্ণ চিত্রকর বা মনু চিত্রকরের মতো নামী শিল্পীরা বিদেশে যাচ্ছেন, তবুও সাধারণ কারিগররা এখনও পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারেননি। সিজনাল বা ঋতুভিত্তিক পর্যটনের ওপর নির্ভরতা তাদের আয়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। করোনা মহামারীর সময় পর্যটন বন্ধ থাকায় তাদের চরম সংকটে পড়তে হয়েছিল ।

১১. উপসংহার

বাংলার পটচিত্র কেবল একটি লোকশিল্প নয়, এটি বাংলার গ্রামীণ ইতিহাসের এক চলমান ধারাভাষ্য। বৌদ্ধ যুগ থেকে শুরু করে ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত এর যাত্রা প্রমাণ করে যে, এই শিল্প কতটা নমনীয় এবং শক্তিশালী। পটুয়া সমাজ তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে শিল্পের সাধনা করা যায়।

‘পটমায়া’র মতো উৎসব এবং জিআই ট্যাগের স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে এই শিল্পকে নতুন জীবন দিয়েছে। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ভারসাম্য রক্ষার ওপর—বাণিজ্যিক চাহিদার সঙ্গে আপস না করে কিভাবে এর ঐতিহ্যবাহী ‘গান’ এবং ‘প্রাকৃতিক রঙ’-এর বিশুদ্ধতা বজায় রাখা যায়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলার পটচিত্রের আগামী দিনের পথচলা। নয়া গ্রামের পটুয়ারা আজ কেবল বাংলার শিল্পী নন, তারা বিশ্বমঞ্চে ভারতের লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রতিনিধি।


তথ্যসূত্র নির্দেশিকা: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যসমূহ বিভিন্ন গবেষণাপত্র এবং নিবন্ধ থেকে সংগৃহীত। উদ্ধৃতিগুলি “ ফরম্যাটে টেক্সটের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।

Works cited

1. The Dying Art of Patachitra Paintings of Rural Bengal and Kolkata: A Mapping of its History and Origin. – Oaklores, https://oaklores.com/2025/09/02/the-dying-art-of-patachitra-paintings-of-rural-bengal-and-kolkata-a-mapping-of-its-history-and-origin/

2. Pattachitra Painting | History, Techniques & Modern Relevance – Creativity Art Gallery, https://www.creativityartgallery.org/discovering-pattachitra-painting-detailed-guide-2024/

3. Pattachitra – Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Pattachitra

4. Facing the Pandemic: A Perspective on Patachitra Artists of West Bengal – MDPI, https://www.mdpi.com/2076-0752/10/3/61

5. Patachitra: Home, https://bengalpatachitra.com/

6. A journey into Bengal Pattachitra- Blog – MeMeraki, https://www.memeraki.com/blogs/posts/unfurling-a-world-of-wonder-a-journey-into-bengal-pattachitra

7. Indian Art Form: Patachitra – Art Lounge, https://blog.artlounge.in/blog/2021/4/8/indian-art-form-patachitra

8. The Patachitra of Bengal, scroll painting from eastern India, https://bongbackpackers.com/the-patachitra-of-bengal-scroll-painting-from-eastern-india/

9. Patachitra – :::::: Daricha Foundation ::::::, https://www.daricha.org/sub_genre.aspx?ID=39&Name=Patachitra

10. Endless Scroll – The Genesis of Bengal’s Pattachitra Art – Sarmaya Arts Foundation, https://sarmaya.in/guides/endless-scroll-the-genesis-of-bengals-pattachitra-art/

11. Kalighat Paintings: Folk Art of East India – ArtZolo.com, https://www.artzolo.com/blogs/art-logs/kalighat-paintings-the-folk-art-of-east-of-india

12. Different styles of Pattachitra Artwork – MeMeraki, https://www.memeraki.com/blogs/posts/pattachitra-a-journey-through-four-artistic-traditions

13. Framing the Goddess: The Almost Forgotten Beauty of Bengal’s Chalchitra Art – Oaklores, https://oaklores.com/2025/07/21/framing-the-goddess-the-almost-forgotten-beauty-of-bengals-chalchitra-art/

14. Chalchitra – Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Chalchitra

15. Pattachitra: An Ancient Folk Art that Reflects the Ethos of India, https://www.exoticindiaart.com/blog/pattachitra-an-ancient-folk-art-that-reflects-the-ethos-of-india/

16. Traditional Color Making Techniques in Kalighat Paintings | Heritage Art – MeMeraki, https://www.memeraki.com/blogs/posts/traditional-color-making-for-kalighat-paintings

17. Unfolding legends of Jagannatha: What is the process of a Pattachitra painting?, https://www.exoticindiaart.com/blog/how-are-pattachitra-paintings-made/

18. How Pattachitra Art Is Made: Step-by-Step Guide to Painting Techniques – Alokya, https://alokya.com/blogs/news/how-pattachitra-art-is-made-step-by-step-guide-to-painting-techniques

19. The Art of Pattachitra. Considering the medium, the paintings… | by Gayatree Tripathy, https://medium.com/@gayatreetripathy/the-art-of-pattachitra-ae48f5d5a55b

20. Patua Painting: Narrating The Rich Folk Art Of West Bengal – iTokri, https://itokri.com/blogs/craft-masala-by-itokri/patua-painting-narrating-the-rich-folk-art-of-west-bengal

21. Vibrant colours of Pot Maya Festival of Pingla – Get Bengal, https://www.getbengal.com/details/vibrant-colours-of-pot-maya-festival-of-pingla

22. Song (Pater Gaan) of Medinipur – Patachitra, https://bengalpatachitra.com/heritage/name-of-the-heritage-attribute-copy-5/

23. Travelling Tales — How an Ancient Folk Tradition Spread Stories and Government Policies Across Bengal | Asia Research News, https://www.asiaresearchnews.com/content/travelling-tales-%E2%80%94-how-ancient-folk-tradition-spread-stories-and-government-policies-0

24. Crossing the Threshold: Women Patuas of Bengal in Transition – The Chitrolekha Journal on Art and Design, https://chitrolekha.com/women-potuas-of-bengal/

25. Patachitra as Contemporary Folk Visual Storytelling – International Journal of Social Science Research (IJSSR), https://www.ijssr.com/wp-content/uploads/journal/published_paper/volume-2/issue-3/IJSSR30438.pdf

26. A Discourse on Patachitra Art with narratives and songs in religious and cultural Scenario of West Bengal., https://ijaem.net/issue_dcp/A%20Discourse%20on%20Patachitra%20Art%20with%20narratives%20and%20songs%20in%20religious%20and%20cultural%20Scenario%20of%20West%20Bengal..pdf

27. Bengal Patachitra weaves tales of resilience and expression – Village Square, https://villagesquare.in/bengal-patachitra-weaves-tales-of-resilience-and-expression/

28. POT Maya – Festivals From India, https://blog.festivalsfromindia.com/festival/pot-maya/

29. Festivals – Patachitra, https://bengalpatachitra.com/festival/

30. Save The Date: This Art Village’s Three-Day Fair Will Showcase Rare Art & Award Winning Artists | LBB, https://lbb.in/kolkata/save-the-date-this-art-4633af/

31. Lokprasar Prakalpo – Vikaspedia – Schemes, https://schemes.vikaspedia.in/viewcontent/schemesall/schemes-for-senior-citizens/lokprasar-prakalpo?lgn=en

32. West Bengal Lok Prasar Prakalpa Scheme, https://www.govtschemes.in/west-bengal-lok-prasar-prakalpa-scheme

33. Journal of Humanities and Social Sciences Studies (JHSSS) A General Analysis of Changes and Problems of Patachitra as a Liveliho – Al-Kindi Publisher, https://al-kindipublishers.org/index.php/jhsss/article/download/285/267/546

34. Where paintings speak: West Bengal’s pattachitra artists battle odds to keep tradition alive, https://www.ptinews.com/story/national/where-paintings-speak:-west-bengal’s-pattachitra-artists-battle-odds-to-keep-tradition-alive/2723431


error: Content is protected !!
Scroll to Top