উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে নবজাগরণের জোয়ার এসেছিল, তার দুই উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। সমসাময়িক এই দুই প্রতিভাবান স্রষ্টার সম্পর্ক, তাঁদের পারস্পরিক সখ্য, পরবর্তীকালের তিক্ততা এবং সেই তিক্ততার ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এক অত্যন্ত বিতর্কিত ও কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়।
বাংলা সাহিত্যের দুই দিগন্তের সংঘাত: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বিতর্ক — একটি ঐতিহাসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বাংলা সাহিত্যের আকাশে যে নবজাগরণের জোয়ার এসেছিল, তার দুই উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। সমসাময়িক এই দুই প্রতিভাবান স্রষ্টার সম্পর্ক, তাঁদের পারস্পরিক সখ্য, পরবর্তীকালের তিক্ততা এবং সেই তিক্ততার ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের এক অত্যন্ত বিতর্কিত ও কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়। এখানে আমরা রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের সম্পর্কের রসায়ন, তাঁদের বিবাদের মূল কারণ, ‘আনন্দ বিদায়’ নাটকের ভূমিকা এবং সমসাময়িক সাহিত্য ও সমাজজীবনের ওপর এই সংঘাতের প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করব। এই বিশ্লেষণ কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশের ইতিহাস নয়, বরং এটি দুটি ভিন্ন সাহিত্যাদর্শের সংঘাত এবং তৎকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজের দলাদলির এক অকাট্য দলিল।
প্রথম অধ্যায়: পটভূমি ও সমসাময়িক সাহিত্যিক পরিবেশ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩)—উভয়েই ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ফসল। রবীন্দ্রনাথ যখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আবহে বড় হচ্ছেন, দ্বিজেন্দ্রলাল তখন কৃষ্ণনগরের এক অভিজাত ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র দুই বছরের। সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁদের প্রবেশও ঘটেছিল প্রায় একই সময়ে। তৎকালীন বাংলা সাহিত্য তখন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে নতুন পথের সন্ধান করছে। একদিকে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার, অন্যদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে যুক্তিবাদী চিন্তাধারার বিকাশ—এই সন্ধিক্ষণে দুই কবির উত্থান।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, বিলেত-ফেরত এবং পেশায় উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট)। তাঁর মানসিকতায় ভিক্টোরিয়ান যুগের নীতিবোধ এবং ইংরেজি সাহিত্যের যুক্তিবাদী কাঠামোর গভীর প্রভাব ছিল । অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মূলত রোমান্টিক এবং মিস্টিসিজমে বিশ্বাসী। তাঁর কবিতায় ছিল উপনিষদীয় দর্শন এবং প্রকৃতির এক অতীন্দ্রিয় রূপ। এই দুই ভিন্ন মেরুর মানসিকতাই পরবর্তীতে তাঁদের সংঘাতের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সংঘাতের আগে ছিল এক দীর্ঘ ও গভীর সখ্যের ইতিহাস।
দ্বিতীয় অধ্যায়: সখ্যের দিনগুলি — আড্ডা, গান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা
রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের সম্পর্কের প্রথমার্ধ ছিল অত্যন্ত মধুর। সমসাময়িক সাহিত্যিক মহলে তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল চর্চার বিষয়। এই অধ্যায়ে আমরা সেই সখ্যের দিনগুলোর বিশদ বিবরণ এবং তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার স্বরূপ অন্বেষণ করব।
২.১ সাহিত্যিক আড্ডা ও বজরার ভ্রমণ
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় যখন আবগারি বিভাগের পরিদর্শক বা ইন্সপেক্টর ছিলেন, তখন কাজের সূত্রে তাঁকে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে হতো। তাঁর একটি নিজস্ব বজরা ছিল, যা সাহিত্যিক আড্ডার এক অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ‘সাহিত্য’ পত্রিকার স্মৃতিচারণ এবং দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকার দেবকুমার রায়চৌধুরীর লেখা থেকে জানা যায় যে, তাঁদের সম্পর্কের শুরুর দিনগুলোতে তাঁরা একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করতেন ।
এমনই এক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলাল একত্রে বজরায় চড়ে খড়দহ পর্যন্ত ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল বাগানে গিয়ে আহারাদি এবং সাহিত্যচর্চা। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেই ভ্রমণ ব্যাহত হয়েছিল। প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে তাঁরা ব্যারাকপুরের কাছে লাটসাহেবের বাগানের ঘাটে বজরা ভিড়াতে বাধ্য হন। সেই রাতে তাঁদের চরম দুর্গতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল—খাবার জুটল সামান্য, থাকার জায়গাও ছিল অপ্রতুল। কিন্তু এই চরম পরিস্থিতির মধ্যেও দুই মহাকবির রসবোধ ও সখ্যের কোনো অভাব ঘটেনি। সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, যিনি সেই যাত্রায় তাঁদের সঙ্গী ছিলেন, লিখেছেন, “দুই মহাকবি এই অসাধারণ কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করিয়াছিলেন এবং অফুরন্ত কৌতুক, কাব্য ও পরিহাসে সেই দারুণ দুশ্চিন্তা ও দুরবস্থাকে আনন্দময় করিয়া রাখিয়াছিলেন” । এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তাঁদের সম্পর্ক কেবল লৌকিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল গভীর হৃদ্যতাপূর্ণ।
২.২ ‘মন্দ্র’ কাব্যগ্রন্থ ও রবীন্দ্রনাথের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা
রবীন্দ্রনাথ যে দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯০২ সালে (১৩০৯ বঙ্গাব্দ)। এই সময় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘মন্দ্র’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় এই কাব্যগ্রন্থের এক দীর্ঘ ও উচ্ছ্বসিত সমালোচনা লেখেন। তিনি লিখেছিলেন, “ইহা নুতনত্বে ঝকঝক করিতেছে এবং এই কাব্যের মধ্যে যে ক্ষমতা প্রকাশ পাইয়াছে তাহা অনায়াসলব্ধ এবং ইহার মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবল আত্মবিশ্বাসের এক অবাধ সাহস বিরাজ করিতেছে” ।
রবীন্দ্রনাথ আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, দ্বিজেন্দ্রলালের কবিতায় এক ধরণের পৌরুষ ও বলিষ্ঠতা আছে, যা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি লিখেছিলেন, “ইহার হাস্য, বিষাদ, বিদ্রূপ, বিস্ময় সমস্তই পুরুষের—তাহাতে চেষ্টাহীন সৌন্দর্যের সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সরলতা আছে” । একজন সমসাময়িক কবির প্রতি, যিনি ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন, এমন অকপট প্রশংসা রবীন্দ্রনাথের ঔদার্যের পরিচয় দেয়। এই সমালোচনা প্রকাশিত হওয়ার পর সাহিত্য সমাজে দ্বিজেন্দ্রলালের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। দ্বিজেন্দ্রলাল নিজেও তখন রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার অনুরাগী ছিলেন এবং তাঁকে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আসন দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
২.৩ পূর্ণিমা মিলনে আবির খেলা: বন্ধুত্বের চূড়ান্ত নিদর্শন
তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতার আরেকটি উজ্জ্বল ও স্মরণীয় দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ১৯০৪ সালে (১৩১১ বঙ্গাব্দ)। দোল পূর্ণিমার দিন দ্বিজেন্দ্রলালের সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে (৫, সুকিয়া স্ট্রিট) ‘সাহিত্যিকী পৌর্ণমাসী সম্মিলন’ বা ‘পূর্ণিমা মিলন’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। সেই উৎসবে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন বাংলার সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনীকার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, রবীন্দ্রনাথ আবির খেলার ভিড়ে প্রথমে একটু দূরেই ছিলেন, হয়তো তাঁর স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্যের কারণে। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল, যিনি ছিলেন প্রাণোচ্ছল ও হাস্যরসিক, নিজেই মুঠো মুঠো ফাগ বা আবির নিয়ে রবীন্দ্রনাথের দিকে এগিয়ে যান এবং তাঁকে আপাদমস্তক রাঙিয়ে দেন। এই ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি, বরং নিজের স্বভাবসুলভ মিষ্টতায় ও রসবোধ মিশিয়ে বলেছিলেন, “আজ দ্বিজুবাবু শুধু আমাদের মনোরঞ্জন করলেন না, আমাদের সর্বাঙ্গ রঞ্জন করলেন” । এরপর রবীন্দ্রনাথ সেই আসরেই গেয়েছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান—”সে যে আমার জননী রে”। দিলীপ কুমার রায় (দ্বিজেন্দ্র-পুত্র) তাঁর স্মৃতিচারণে এই দিনের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের গানে এবং উপস্থিতিতে সেই সন্ধ্যা এক অন্য মাত্রা পেয়েছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ১৯০৪ সাল পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে কোনো মনোমালিন্য ছিল না, বরং ছিল নির্মল আনন্দ ও ভ্রাতৃত্ববোধ।
তৃতীয় অধ্যায়: বিরোধের সূত্রপাত — ‘বঙ্গভাষার লেখক’ ও আত্মজীবনীর বিতর্ক
এত গভীর বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও, ১৯০৫ সালের পরবর্তী সময়ে এই সম্পর্কে ফাটল ধরতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল না, বরং ছিল একাধিক ঘটনার সমষ্টি, ভুল বোঝাবুঝি এবং তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন। তবে বিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গটি জ্বলে ওঠে একটি বইকে কেন্দ্র করে।
৩.১ ‘বঙ্গভাষার লেখক’ ও রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য
রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র বিতর্কের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘বঙ্গভাষার লেখক’ নামক একটি গ্রন্থকে। হরিমোহন মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই গ্রন্থের প্রথম ভাগে সমসাময়িক অনেক লেখকের জীবনী স্থান পায়। রবীন্দ্রনাথকেও তাঁর জীবনী লেখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই অনুরোধের উত্তরে একটি সংক্ষিপ্ত ‘আত্মজীবনী’ পাঠান। কিন্তু সেই লেখার ভাষা ও ভঙ্গি দ্বিজেন্দ্রলালের মনে আঘাত দিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন: “আমার জীবনবৃত্তান্ত লিখিতে আমি অনুরুদ্ধ হইয়াছি। অনাবশ্যক বিনয় প্রকাশ করিয়া এখানে স্থান জুড়িব না। কিন্তু গোড়াতেই এ কথা বলা আবশ্যক যে, জীবনবৃত্তান্ত লিখিবার বিশেষ শক্তি বিশেষ লোকের থাকে, আমার তাহা নাই। না থাকিলেও কোনো ক্ষতি নাই; আমার জীবনবৃত্তান্তের বিস্তারিত বর্ণনায় কাহারো কোনো লাভ দেখি না” ।
তিনি আরও যোগ করেন: “অতএব আমার জীবনবৃত্তান্ত হইতে ‘বৃত্তান্ত’ অংশটা আমি এখানে বাদ দিলাম। আমার কাব্যের ভিতর দিয়া আমার জীবনটি আমার কাছে কি ভাবে ব্যক্ত হইয়াছে আমি কেবল তাহাই সংক্ষেপে লিখিবার চেষ্টা করিব” ।
আপাতদৃষ্টিতে এই মন্তব্যটি ছিল রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জীবনদর্শন ও বিনয়ের প্রকাশ। তিনি মনে করতেন, একজন কবির ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি ঘটনার চেয়ে তাঁর কাব্যজীবন বা মানসজীবনের ইতিহাস পাঠকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই মন্তব্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের এই লেখনী অত্যন্ত অহংকারী এবং অন্যদের প্রতি অবজ্ঞাসূচক। বিশেষ করে, ওই সংকলনে দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনী অনুপস্থিত ছিল কি না, বা থাকলেও তা রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ম্লান হয়ে গিয়েছিল কি না, তা বিতর্কের বিষয়। দ্বিজেন্দ্রলাল মনে করলেন, রবীন্দ্রনাথ নিজেকে সাধারণ লেখকদের ঊর্ধ্বে স্থাপন করছেন এবং অন্যের জীবনী লেখার প্রচেষ্টাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন।
৩.২ পত্রযুদ্ধ ও ভুল বোঝাবুঝি
এই লেখা পড়ার পর দ্বিজেন্দ্রলাল অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং রবীন্দ্রনাথকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন। সেই চিঠির ভাষা ছিল তীব্র এবং আক্রমণাত্মক। তিনি রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অহংকার ও দাম্ভিকতার অভিযোগ আনেন। রবীন্দ্রনাথ সেই চিঠির উত্তরে অত্যন্ত সংযত ভাষায় ছয় পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ পত্র লেখেন (২৩শে বৈশাখ, ১৩১২ বঙ্গাব্দ), যেখানে তিনি তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন।
রবীন্দ্রনাথ লেখেন: “আপনি আমাকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলিয়াছেন যে আমার সম্বন্ধে এবং আমাদের সম্বন্ধে আপনার যাহা মনোভাব তাহা আপনি আমার সাক্ষাতে এবং সাধারণের সাক্ষাতে অসংকোচে ঘোষণা করিতে পারেন—সে তো ভালোই—এই বয়সে যদি কিছু শিক্ষালাভ করিয়া থাকি তবে আশা করি আপনার অপ্রিয় আচরণ আমার পক্ষে অসহ্য হইবে না” ।
রবীন্দ্রনাথের এই উত্তরেও দ্বিজেন্দ্রলালের রাগ প্রশমিত হয়নি। বরং তিনি মনে করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমালোচনাকে গ্রাহ্যই করছেন না। এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব লক্ষণীয়। রবীন্দ্রনাথ তখন বাংলা সাহিত্যের ‘রবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবারের সন্তান। অন্যদিকে দ্বিজেন্দ্রলাল ছিলেন উচ্চশিক্ষিত সরকারি আমলা ও প্রতিভাবান কবি, কিন্তু হয়তো অবচেতন মনে রবীন্দ্রনাথের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও ‘অভিজাত’ ঔদাসীন্যের প্রতি তাঁর এক ধরণের স্পর্শকাতরতা বা ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ (হীনম্মন্যতা) কাজ করত। রবীন্দ্রনাথের বিনয়কে তিনি ‘দম্ভ’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন।
চতুর্থ অধ্যায়: সাহিত্যিক মতাদর্শের সংঘাত ও ‘সোনার তরী’ বিতর্ক
ব্যক্তিগত মনোমালিন্য শীঘ্রই সাহিত্যিক সমালোচনার রূপ নেয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় পাশ্চাত্য সাহিত্য, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের যুক্তিবাদ ও স্পষ্টতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর নাটক ও কাব্যে আবেগের প্রকাশ ছিল প্রত্যক্ষ ও নাটকীয়। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, বিশেষ করে ‘সোনার তরী’ পর্বের কবিতাগুলো ছিল সিম্বলিজম বা প্রতীকীবাদ এবং অতীন্দ্রিয়বাদে পূর্ণ। এই আদর্শগত পার্থক্যই পরবর্তী বিতর্কের ভিত্তি রচনা করে।
৪.১ ‘অস্পষ্টতা’র অভিযোগ
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) ‘কাব্যের অভিব্যক্তি’ নামক এক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কাব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর প্রধান অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘অস্পষ্ট’, ‘ধোঁয়াশাচ্ছন্ন’ এবং ‘অর্থহীন’।
দ্বিজেন্দ্রলাল লিখেছিলেন: “বঙ্গের অস্পষ্ট কবিগণ বড়োই অধিক শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও ব্রাউনিং এর দোহাই দেন। এই ইংরাজ কবিগণ স্থানে স্থানে দুর্বোধ্য বটে। কিন্তু (ব্রাউনিং ছাড়া) তাঁহাদের কাব্যের মূল বা কেন্দ্রস্থ ভাব ধরিতে কষ্ট হয় না। কিন্তু আমাদের বঙ্গীয় কবিগণের কাব্যের কোনও ভাবই ধরা যায় না। আমাদের দেশের এই অস্পষ্ট কবিদের অগ্রণী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর” ।
তিনি আরও ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন: “রবিবাবু যা’ই লেখেন তাতেই তাধিন-তাকি-ধিন-তাকি ম্যাও এঁও-ওঁও- বলে কোরাস দিতে পারি না” ।
দ্বিজেন্দ্রলালের মতে, কাব্য হতে হবে স্পষ্ট এবং সর্বজনবোধ্য। রবীন্দ্রনাথের অতীন্দ্রিয়বাদকে তিনি প্রলাপ বা অসার কল্পনা বলে মনে করতেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রনাথের কবিতার কোনো মাথামুণ্ডু নেই, অথচ একদল ভক্ত অন্ধভাবে তার প্রশংসা করে চলেছে।
৪.২ ‘রবি-চক্র’ ও ভক্তদের প্রতিক্রিয়া
দ্বিজেন্দ্রলালের এই আক্রমণ কেবল রবীন্দ্রনাথের রচনার ওপর ছিল না, বরং এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ভক্তকুল বা ‘রবি-চক্র’-এর বিরুদ্ধেও। তিনি মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথের চারপাশে এমন একদল চাটুকার বা অন্ধ ভক্ত তৈরি হয়েছে, যারা না বুঝেই কবির সব কিছুতে ‘বাহবা’ দেয়। তিনি এই ভক্তদের ব্যঙ্গ করতেন এবং মনে করতেন তাঁরাই রবীন্দ্রনাথকে অহংকারী করে তুলেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই, রবীন্দ্র-অনুরাগীরা এই সমালোচনার জবাব দিতে শুরু করেন। যদুনাথ সরকার, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ সাহিত্যিকরা ‘সোনার তরী’র আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং দ্বিজেন্দ্রলালের সমালোচনাকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলাল এতে আরও ক্ষিপ্ত হন এবং তাঁর আক্রমণের ধার আরও বাড়িয়ে দেন।
পঞ্চম অধ্যায়: ‘কাব্যে নীতি’, ‘অশ্লীলতা’ এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতি
বিতর্ক আরও কদর্য রূপ ধারণ করে যখন দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ‘অশ্লীলতা’ ও ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ তোলেন। এই পর্যায়ে বিতর্কে প্রবেশ করেন ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একজন কঠোর সমালোচক।
৫.১ ‘কাব্যে নীতি’ প্রবন্ধ ও অশ্লীলতার অভিযোগ
১৩১৬ বঙ্গাব্দের (১৯০৯-১০ সাল) জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় দ্বিজেন্দ্রলাল ‘কাব্যে নীতি’ নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । এই প্রবন্ধে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতা এবং গানগুলোকে ‘লম্পট বা অভিসারিকার গান’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন যে, এই ধরণের সাহিত্য সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে।
দ্বিজেন্দ্রলাল ভিক্টোরিয়ান যুগের নীতিবোধে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমাজকে উন্নত করা এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়া। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা, বিশেষ করে নর-নারীর প্রেমের খোলামেলা এবং গভীর আবেগপূর্ণ প্রকাশকে তিনি ‘অশ্লীল’ বলে মনে করতেন। তিনি এতটাই উত্তেজিত ছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’কে পুড়িয়ে ফেলার নিদান দিয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথকে ‘অশ্লীলতম’ প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন । তিনি লিখেছিলেন, “চিত্রাঙ্গদা কাব্যখানি প্লেগের মতো বর্জনীয়”।
৫.২ সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ও ‘সাহিত্য’ পত্রিকার নেতিবাচক ভূমিকা
এই বিবাদে ইন্ধন জোগানোর ক্ষেত্রে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি এবং তাঁর সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক এবং ষড়যন্ত্রমূলক। সুরেশচন্দ্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিরোধী শিবিরের নেতা। তিনি দ্বিজেন্দ্রলালের ক্ষোভ ও অভিমানকে কাজে লাগিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘমেয়াদী ক্যাম্পেইন বা প্রচারযুদ্ধ শুরু করেন। ‘সাহিত্য’ পত্রিকা হয়ে ওঠে রবীন্দ্র-বিদ্বেষের প্রধান মঞ্চ।
সুরেশচন্দ্র সমাজপতি একসময় রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’র প্রশংসা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে ব্যক্তিগত কারণে তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘোর বিরোধী হয়ে ওঠেন। তিনি দ্বিজেন্দ্রলালকে উস্কে দিতেন এবং তাঁর পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ব্যঙ্গাত্মক ও আক্রমণাত্মক লেখা প্রকাশ করতেন। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর মতো কবিরাও, যারা প্রথমে রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন, এই দলাদলির শিকার হন এবং সাময়িকভাবে দ্বিজেন্দ্রলালের পক্ষে যোগ দেন, যদিও পরে তাঁদের মোহভঙ্গ হয় । সুরেশচন্দ্র সমাজপতি লিখেছিলেন, “রবীন্দ্রবাবু বাঙ্গালা ভাষাকে কোন পাতালে লইয়া যাইতে চান, তাহা আমরা অনুমান করিতে পারিতেছি না” ।
ষষ্ঠ অধ্যায়: ‘আনন্দ বিদায়’ — সংঘাতের চরম নাটকীয় মুহূর্ত
রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র বিতর্কের সবচেয়ে কলঙ্কজনক, নাটকীয় এবং মর্মান্তিক অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯১২ সালে, যখন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘আনন্দ বিদায়’ নামে একটি প্রহসন বা প্যারোডি নাটক রচনা ও মঞ্চস্থ করেন। এই ঘটনা বাংলা থিয়েটার এবং সাহিত্যের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
৬.১ নাটকের বিষয়বস্তু ও প্যারোডি
‘আনন্দ বিদায়’ নাটকটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই রবীন্দ্রনাথের প্রতি এক নির্মম ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। এই নাটকে দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে বিদ্রূপের তীর ছুড়েছিলেন। নাটকের কাহিনি ও চরিত্র চিত্রণে তিনি রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব, তাঁর সাহিত্য এবং তাঁর ভক্তদের হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।
সবচেয়ে বিতর্কিত ছিল রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গানগুলোর প্যারোডি। দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত জনপ্রিয়, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিক গানগুলোকে বিকৃত করে লঘু ও হাস্যকর প্যারোডি তৈরি করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ:
- রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক ও গম্ভীর গান “ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে”-কে বিকৃত করে তিনি লিখেছিলেন “এন.ডি. রায়-র মেয়ে” (N.D. Ray-r meye) বা এই জাতীয় হাস্যকর পঙক্তি ।
- রবীন্দ্রনাথের “আমি কান পেতে রই” বা “তবু পারিনে সঁপিতে প্রাণ”-এর মতো গানগুলোর সুর ও ভাবকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল ।
- ‘সোনার তরী’ কবিতারও প্যারোডি করা হয়, যেখানে কবিতার অস্পষ্টতাকে উপহাস করা হয়েছিল।
নাটকের নাম ‘আনন্দ বিদায়’ নিজেই ছিল ইঙ্গিতপূর্ণ—এর অর্থ হতে পারে রবীন্দ্রনাথের (যিনি নিজেকে প্রায়ই ‘আনন্দ’ বা আনন্দের উপাসক হিসেবে দেখতেন) বিদায় বা সাহিত্যের জগত থেকে তাঁর প্রস্থান কামনা। দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কৌতুকরস ও ব্যঙ্গক্ষমতা (Wit and Satire) ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথকে অসার, মেকি এবং অহংকারী প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।
৬.২ স্টার থিয়েটারের দাঙ্গা ও দ্বিজেন্দ্রলালের অপমান
১৯১২ সালের ১৬ই নভেম্বর (মতান্তরে তারিখটি সামান্য ভিন্ন হতে পারে, তবে সালটি নিশ্চিতভাবে ১৯১২) কলকাতার বিখ্যাত স্টার থিয়েটারে ‘আনন্দ বিদায়’ নাটকের মঞ্চায়ন শুরু হয় । কিন্তু নাটকের বিষয়বস্তু এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি এই নগ্ন আক্রমণ কলকাতার শিক্ষিত সমাজ, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ মেনে নিতে পারেনি।
নাটক চলাকালীন প্রেক্ষাগৃহে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দর্শকরা, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল রবীন্দ্র-অনুরাগী ছাত্র, ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা মঞ্চের দিকে জুতো, ঢিল, পচা ডিম এবং অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করতে থাকে। প্রবল হট্টগোল ও স্লোগানে নাটকের সংলাপ শোনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, নাটকটি মাঝপথেই বন্ধ করে দিতে হয়।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, যিনি সেই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও গীতিকার হিসেবে সম্মানিত ছিলেন, তাঁকে নিজের প্রাণ ও সম্মান বাঁচাতে পেছনের দরজা দিয়ে (Backdoor) থিয়েটার থেকে চোরের মতো পালিয়ে যেতে হয় । তাঁর জীবনীকার দেবকুমার রায়চৌধুরী লিখেছেন যে, স্টার কর্তৃপক্ষ সেদিন দ্বিজেন্দ্রলালকে পিছনের দরজা দিয়ে বার করে দিয়েছিলেন। এই ঘটনাটি ছিল দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনের এক চরম অপদস্থ হওয়ার মুহূর্ত। তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর ব্যঙ্গাত্মক রচনা মানুষ উপভোগ করবে, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে, রবীন্দ্রনাথ তখন বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথকে এভাবে জনসমক্ষে অপমান করার চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছিল এবং এটি দ্বিজেন্দ্রলালের জনপ্রিয়তায় বড় আঘাত হানে।
৬.৩ রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া ও ঔদার্য
‘আনন্দ বিদায়’ নিয়ে যখন কলকাতায় তুমুল তোলপাড়, তখন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শান্তিনিকেতনে অথবা বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতিতে (১৯১২ সালে তিনি আমেরিকা ভ্রমণেও গিয়েছিলেন)। এই পুরো ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আশ্চর্যরকম শান্ত, ধীর ও স্থির। তিনি এই কাদা ছোড়াছুড়িতে নিজেকে জড়াননি। তিনি জানতেন, উত্তেজনার বশে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালে তা কেবল বিতর্কের আগুনকেই উস্কে দেবে।
তিনি তাঁর অনুরাগী ও বন্ধুদেরও শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দীনেশচন্দ্র সেনকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছিলেন: “আমরা বৃথা সকল জিনিষকে বাড়াইয়া দেখিয়া নিজের মনের মধ্যে অশান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করি” ।
এমনকি, দ্বিজেন্দ্রলাল যখন তাঁকে আক্রমণ করছেন, তখনও রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের লেখা একটি ইংরেজি বইকে স্কুল পাঠ্য করার সুপারিশ করে ক্ষিতিমোহন সেনকে চিঠি লিখেছিলেন। এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের ঔদার্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ব্যক্তিগত আক্রোশকে সাহিত্যের মূল্যায়নে স্থান দেননি। তিনি দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, যদিও দ্বিজেন্দ্রলাল তখন তাঁর ঘোর শত্রু।
সপ্তম অধ্যায়: অনুশোচনা, মৃত্যু এবং দিলীপ কুমার রায়ের ভূমিকা
‘আনন্দ বিদায়’ পর্বের পর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় খুব বেশিদিন জীবিত ছিলেন না। ১৯১৩ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু হয়। কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। স্টার থিয়েটারের ঘটনা, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির সম্ভাবনা (১৯১৩ সালেই তিনি নোবেল পান, তবে দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যুর কয়েকমাস পরে) এবং রবীন্দ্রনাথের নিরবচ্ছিন্ন গাম্ভীর্য তাঁকে গভীর অনুশোচনায় দগ্ধ করেছিল।
৭.১ দ্বিজেন্দ্রলালের স্বীকারোক্তি ও অনুতাপ
মৃত্যুর কিছুদিন আগে দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর পুত্র দিলীপ কুমার রায়ের কাছে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি রবীন্দ্রনাথের ওপর অবিচার করেছেন। দিলীপ কুমার রায়, যিনি নিজেও পরবর্তীকালে একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও লেখক হয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিকথায় (যেমন ‘স্মৃতিচারণ’, ‘তীর্থংকর’, ‘Among the Great’) এই প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন।
তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন: “সত্যিই আমার অত্যন্ত ভুল হয়ে গেছে, আমি আর এমন কাজ করব না” ।
দ্বিজেন্দ্রলাল স্বীকার করেছিলেন যে, ঝোঁকের মাথায় এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতির মতো কিছু ‘কুবুদ্ধি দাতার’ প্ররোচনায় তিনি তাঁর একসময়ের শ্রদ্ধেয় বন্ধুকে আক্রমণ করে ফেলেছিলেন। তিনি দিলীপ কুমারকে বলেছিলেন: “না রে না, আমাকে কি রবিবাবুকে (কেউ) ভুলে যাবে না… আমরা রেখে যাচ্ছি যা বাঙালির প্রাণের জিনিস— সুরে বাঁধা গান” ।
এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, দ্বিজেন্দ্রলাল আদতে একজন সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন, কিন্তু সাময়িক ক্রোধ ও ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তিনি ভুল পথে চালিত হয়েছিলেন।
৭.২ রবীন্দ্রনাথ ও দিলীপ কুমার: সেতুবন্ধন ও পুনর্মিলন
দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দিলীপ কুমার রায় হয়ে ওঠেন দুই পরিবারের মধ্যে পুনর্মিলনের সেতু। দিলীপ কুমার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন। রবীন্দ্রনাথ দিলীপ কুমারকে লেখা চিঠিতে তাঁর পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। ১৯২৪ সালে (১৩৩০ বঙ্গাব্দ) লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ দিলীপ কুমারকে লেখেন: “তোমার পিতাকে আমি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা করেছি” ।
রবীন্দ্রনাথ দিলীপ কুমারকে সঙ্গীত ও ছন্দের বিষয়ে উৎসাহিত করতেন। দিলীপ কুমার যখন রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে চাইতেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। দিলীপ কুমার তাঁর পিতার মতোই সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন এবং তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে তাঁর নিজস্ব গায়কী ও পিতার প্রবর্তিত ধারায় গাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জানতেন দিলীপের গলায় সুরের কারুকাজ ( তান, বিস্তার) বেশি, যা রবীন্দ্রনাথের গানের মূল ধারার বিপরীত, তবুও তিনি স্নেহের বশে দিলীপকে সেই অনুমতি দিয়েছিলেন । দিলীপ কুমারের মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথ এবং দ্বিজেন্দ্রলালের বিদেহী আত্মার এক ধরণের মিলন ঘটেছিল। রবীন্দ্রনাথ দিলীপকে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে বন্ধুর মতো, পুত্রের মতো দেখি” ।
অষ্টম অধ্যায়: তুলনামূলক সাহিত্য বিচার ও উত্তরাধিকার
রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের সংঘাতের মূলে কেবল ব্যক্তিগত রেষারেষি ছিল না, ছিল দুটি ভিন্ন সাহিত্য ধারার সংঘাত।
৮.১ বাস্তবতা বনাম আধ্যাত্মিকতা
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন দেশাত্মবোধক গান ও ঐতিহাসিক নাটকের রাজা। তাঁর ‘মেবার পতন’, ‘সাজাহান’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকগুলো বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনায় আগুন জ্বালিয়েছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর গানগুলো (“বঙ্গ আমার জননী আমার”, “ধনধান্য পুষ্প ভরা”) ছিল বিপ্লবীদের মন্ত্র । তিনি চাইতেন সাহিত্য হবে স্পষ্ট, বোধগম্য এবং সমাজের জন্য প্রত্যক্ষভাবে হিতকর। তাঁর নাটকে ঐতিহাসিক চরিত্রদের মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক রাজনৈতিক বার্তা দিতেন।
অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বজনীন ও আধ্যাত্মিক। তাঁর স্বদেশী গানগুলোতেও (‘আমার সোনার বাংলা’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’) ছিল এক গভীর স্নিগ্ধতা ও প্রার্থনার সুর । তাঁর কবিতা ছিল উপমা ও প্রতীকে ভরা। দ্বিজেন্দ্রলাল এই ‘অস্পষ্টতা’ বা Mysticism-কে দুর্বলতা মনে করতেন, যা আসলে ছিল রবীন্দ্রনাথের শক্তি। দ্বিজেন্দ্রলাল চাইতেন সাহিত্যের ভাষা হবে শানিত তরবারির মতো, আর রবীন্দ্রনাথের ভাষা ছিল প্রদীপের শিখার মতো—যা আলো দেয় কিন্তু দগ্ধ করে না।
৮.২ বাংলা গানে অবদান
বাংলা গানে উভয়ের অবদান অসামান্য। রবীন্দ্রনাথের গান (রবীন্দ্রসঙ্গীত) যেমন বাঙালির প্রাণের আরাম, তেমনই দ্বিজেন্দ্রগীতি (দ্বিজেন্দ্রলালের গান) বাঙালির রক্তে দোলা দেওয়া উদ্দীপনা। দ্বিজেন্দ্রলাল পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সুর (যেমন আইরিশ টিউন বা স্কটিশ মার্চ) বাংলা গানে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও পাশ্চাত্য সুর ভেঙে গান তৈরি করেছেন (যেমন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য়), তবে দ্বিজেন্দ্রলালের গানে সেই প্রভাব ছিল অনেক বেশি নাটকীয়, ছন্দময় এবং প্রত্যক্ষ । দ্বিজেন্দ্রলালের গানে কোরাস বা সমবেত সঙ্গীতের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, যা মঞ্চে অভাবনীয় প্রভাব ফেলত।
৮.৩ ইতিহাসের পাঠ ও বর্তমান মূল্যায়ন
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই বিতর্ককে দেখলে মনে হয়, এটি ছিল বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। প্রতিভায় প্রতিভায় সংঘাত নতুন সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে, যদিও এক্ষেত্রে তা ব্যক্তিগত তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছিল। দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারোডিগুলো আজ আর সেভাবে পঠিত হয় না, কিন্তু তাঁর নাটক ও দেশাত্মবোধক গানগুলো আজও অমর। রবীন্দ্রনাথ তো কালজয়ী।
এই বিবাদ আমাদের শেখায় যে, সমসাময়িক সমালোচনা সবসময় সঠিক হয় না। দ্বিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্রনাথকে ‘অস্পষ্ট’ বলেছিলেন, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেই বিশ্ব খুঁজে পেয়েছিল গভীর দর্শন। আবার রবীন্দ্রনাথের প্রতি অন্ধভক্তিও যে সমালোচনার পথ রুদ্ধ করতে পারে, দ্বিজেন্দ্রলাল সম্ভবত সেদিকেই আঙুল তুলতে চেয়েছিলেন, যদিও তাঁর পদ্ধতিটি ছিল ভুল এবং ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক।
নবম অধ্যায়: উপসংহার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিতর্ক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক কিন্তু শিক্ষণীয় অধ্যায়। এটি ছিল দুই মহান প্রতিভার অহংকারের লড়াই, আদর্শের সংঘাত এবং ভুল বোঝাবুঝির ট্র্যাজেডি। ‘আনন্দ বিদায়’ নাটকের মাধ্যমে এই সংঘাত চরম সীমায় পৌঁছায় এবং তা দ্বিজেন্দ্রলালের জন্য এক সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
তবে এই তিক্ততার আড়ালে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের ফল্গুধারা ছিল, তা দিলীপ কুমার রায়ের স্মৃতিচারণ ও রবীন্দ্রনাথের শেষদিকের চিঠিগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ যেমন দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভার প্রতি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তেমনই দ্বিজেন্দ্রলালও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের ভুল স্বীকার করে রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্বকে মেনে নিয়েছিলেন। আজ যখন আমরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করি, তখন এই দুই মহীরুহকে একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং বাংলা মা’র দুই কৃতী সন্তান হিসেবেই স্মরণ করি—যাঁরা ভিন্ন পথে হেঁটেও একই গন্তব্যে পৌঁছেছিলেন, আর তা হলো বাঙালির সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক মুক্তি। দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকীয়তা এবং রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতা—উভয়ই বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
সারণী ১: রবীন্দ্র-দ্বিজেন্দ্র সম্পর্কের কালপঞ্জি ও প্রধান ঘটনাবলী
| সময়কাল | ঘটনা | বিবরণ | সূত্র |
|---|---|---|---|
| ১৯০২ | ‘মন্দ্র’ কাব্যের প্রকাশ | রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গদর্শন’-এ দ্বিজেন্দ্রলালের কাব্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। | |
| ১৯০৪ | হোলি উৎসব (দোল পূর্ণিমা) | দ্বিজেন্দ্রলালের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া ও আবির খেলা। বন্ধুত্বের নিদর্শন। | |
| ১৯০৪-০৫ | ‘বঙ্গভাষার লেখক’ বিতর্ক | আত্মজীবনী লেখা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য ও দ্বিজেন্দ্রলালের ক্ষোভ। বিবাদের সূত্রপাত। | |
| ১৯০৬-১০ | সাহিত্যিক আক্রমণ | ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘সোনার তরী’ ও ‘চিত্রা’র সমালোচনা। ‘অস্পষ্টতা’র অভিযোগ। | |
| ১৯০৯-১০ | ‘কাব্যে নীতি’ প্রবন্ধ | ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ‘অশ্লীলতা’র অভিযোগ ও ‘চিত্রাঙ্গদা’ পোড়ানোর হুমকি। | |
| ১৯১২ (১৬ নভেম্বর) | ‘আনন্দ বিদায়’ নাটক | রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করে লেখা নাটক মঞ্চস্থ। স্টার থিয়েটারে দাঙ্গা ও দ্বিজেন্দ্রলালের পলায়ন। | |
| ১৯১৩ | দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যু | মৃত্যুর পূর্বে পুত্র দিলীপ কুমারের কাছে অনুশোচনা ও ভুল স্বীকার। | |
| ১৯১৩ | রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি | দ্বিজেন্দ্রলালের মৃত্যুর কয়েকমাস পর। | |
| ১৯২৪ | দিলীপ কুমারকে চিঠি | রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লেখেন, “তোমার পিতাকে আমি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা করেছি”। |
সারণী ২: প্যারোডি ও মূল গানের তুলনা
| রবীন্দ্রনাথের মূল গান/কবিতা | দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারোডি (আনন্দ বিদায়) | প্রকৃতি | সূত্র |
|---|---|---|---|
| “ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে” | “এন.ডি. রায়-র মেয়ে” (N.D. Ray-r meye) | অত্যন্ত লঘু ও হাস্যকর | |
| “আমি কান পেতে রই” | প্যারোডি সংস্করণ | সুর ও ভাবকে ব্যঙ্গ | |
| “সোনার তরী” (কবিতা) | কবিতার প্যারোডি | অস্পষ্টতা ও রূপককে উপহাস |
এই বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের সম্পর্ক ছিল এক জটিল সমীকরণ, যেখানে প্রেম, শ্রদ্ধা, ঈর্ষা, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং অনুশোচনা—সবই বিদ্যমান ছিল। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিভাধর মানুষেরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন, কিন্তু প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত থাকে সেই ভুল স্বীকার এবং ক্ষমা করার মধ্যে।
Works cited
1. রবীন্দ্রনাথ ও ডি এল রায়: একটি 'চিড় ধরা' সম্পর্কের বয়ান - প্রথম আলো, https://www.prothomalo.com/onnoalo/gshf7ba6l4
2. The Dwijendralal we never knew - Get Bengal, https://www.getbengal.com/details/the-dwijendralal-we-never-knew
3. রবীন্দ্র-বিরোধিতার জের, বন্ধু দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ..., https://www.prohor.in/controversy-between-jatindramohan-bagchi-and-dwijendralal-ray
4. Rabindranath and DL Roy were friends before they became ..., https://banglalive.com/rabindranath-and-dl-roy/
5. রবীন্দ্রনাথকে 'অশ্লীলতম' প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল, https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/dwijendralal-wanted-to-prove-rabindranath-indecency
6. WHAT TWO ARTISTS HAVE LEFT BEHIND - Telegraph India, https://www.telegraphindia.com/opinion/what-two-artists-have-left-behind/cid/394588
7. Chronological representation of Rabindranath Tagore's biography. - Rabindra Tirtha, https://www.rabindratirtha-wbhidcoltd.co.in/Rabisarani/search
8. Letter written by Rabindranath Tagore to Dilip Kumar Ray - Google Arts & Culture, https://artsandculture.google.com/asset/letter-written-by-rabindranath-tagore-to-dilip-kumar-ray/XAEOcWa08Z00rQ?hl=en
9. Dilipkumar Roy - Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Dilipkumar_Roy
10. Sri Aurobindo to Dilip Volume I, Read Book - Dilip Kumar Roy, https://motherandsriaurobindo.in/disciples/dilip-kumar-roy/books/sri-aurobindo-to-dilip-volume-i/
11. The archaeology of literature - The Statesman, https://www.thestatesman.com/books-education/the-archaeology-of-literature-1502778514.html
12. Music of Bengal - Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Music_of_Bengal

