ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী 


প্রথম প্রকাশ — ১২৯১ বঙ্গাব্দ (১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ) 

পত্রিকার পাতায়— 

১২৮৪ বঙ্গাব্দে (১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে) ভারতী’র প্রথম বর্ষের আশ্বিন-চৈত্র সংখ্যায় এই কাব্য সংকলন-এর কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।

এই সংকলন সম্বন্ধে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেছেন,
……এই গ্রন্থ [ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী] কোনো একটা ধারা বা স্তর নির্দেশ করে না। ইহা একটা সার্থক অনুকরণ মাত্র, কবির নিজস্ব প্রতিভাযর কোনো ছাপ বা বৈশিষ্ট্য ইহাতে নাই। (রবীন্দ্র-কাব্য-পরিক্রমা)

পূর্বলেখ

সারদাচরন মিত্র ও অক্ষয়চন্দ্র সরকার ‘প্রাচীন কাব্য সংগ্রহ’ নামে বৈষ্ণব পদাবলির একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। কিশোর বয়সে কবি সেই কবিতা সংকলন বিশেষ আগ্রহ ও মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করেছিলেন। আর সেই সময়ে কবির মনে হলো তিনিও নিজেকে রহস্যাবৃত করে রচনা করবেন এমন কাব্য। 

কবি রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি’তে জানাচ্ছেন,

….সেই মেঘলা দিনের ছায়াঘন আকাশের আনন্দে বাড়ির ভিতরের এক ঘরে খাটের উপর উপুড় হইয়া পড়িয়া একটি শ্লেট লইয়া লিখলাম ‘গহন কুসুমকুঞ্জ মাঝে’। লিখিয়া ভারি খুশি হইলাম।

ভানুসিংহ ঠাকুরের ছদ্মনামে পদগুলি প্রকাশের পিছনে আরেকটি কারণ ছিল। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষক অক্ষয় চৌধুরীর কাছে ইংরেজ-কবি চাটারটনের গল্প শুনেছিলেন। কিশোর কবি নাকি প্রাচীন কবিদের ভাষা-ছন্দের অনুকরণে Rowley Poems নামে একটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর নিজের রচিত এই বলে। এবং শুধু তাই নয়, তিনি সেই স্বরচিত কবিতা রাউলি-রচিত বলে প্রচার করতে শুরু করেন। যাইহোক রবীন্দ্রনাথও ‘কোমর বাঁধিয়া দ্বিতীয় চ্যাটারটন হইবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত’ হলেন।

ভারতী তে যখন ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ প্রকাশ হতে শুরু করে তখন সমসাময়িক সাহিত্য মহলে হইচই পড়ে গিয়েছিল। সকলের ধারণা ছিল, এগুলি অজানা প্রাচীন কোনো কবির রচিত পদ। এ কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি’তে  বলেছিলেন,

ভানুসিংহ যখন ভারতী’তে বাহির হইতেছিল ডাক্তার নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তখন জর্মনিতে ছিলেন। তিনি য়ুরোপীয় সাহিত্যের সহিত তুলনা করিয়া আমাদের দেশের গীতিকাব্য সম্বন্ধে একখানি চটি বই লিখিয়াছেন। তাহাতে ভানুসিংহকে তিনি প্রাচীন পদকর্তারূপে যে প্রচুর সম্মান দিয়াছিলেন কোনো আধুনিক কবির ভাগ্যে তাহা সহজে জোটে না। এই গ্রন্থখানি লিখিয়া তিনি ডাক্তার উপাধি লাভ করিয়াছিলেন।
[প্রসঙ্গত উল্লেখ্য নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায়, উক্ত রবীন্দ্রনাথ কথিত বই লিখে ডক্টরেট উপাধি পান নি। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় ছিল The Jatras or the Popular Dramas of Bengal.]

‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’র প্রকৃত লেখক কে এই প্রশ্ন নিয়ে যখন তৎকালীন সাহিত্য মহলে বহুদিন আলোচনা চলেছে। তখন রবীন্দ্রনাথ ১২৯১ বঙ্গাব্দের [১৮৮৪ খ্রি:] নবজীবন পত্রিকায় জানান,

….আবার কোন কোন মূর্খ গোপনে আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের নিকটে প্রচার করিয়া বেড়ায় যে ভানুসিংহ ১৮৬১ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করিয়া ধরাধাম উজ্জ্বল করেন।

আলোচ্য কাব্যসংকলনের মধ্যে অনুকরণ চাতুর্য যতই প্রকাশ পাক না কেন কিংবা রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এই কাব্য সম্বন্ধে কৃত্রিমতা প্রদর্শনের দোষারোপ আনুন না কেন, কয়েকটি কবিতা যে সত্যই কাব্য সৌন্দর্যের অধিকারী তা উল্লেখ্য।

‘মরণ রে তুহুঁ মম শ্যাম সমান’ কিংবা ‘কো তুহুঁ বোলবি মোয়’ সত্যই অতুলনীয় কবিত্বের অধিকারী।

——————————————————————-
——————————————————————-
আরো পড়ুন

আরো পড়ুন :  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দুর্গাপূজা, লিখেছেন অরিন্দম ঘোষাল

——————————————————————-
——————————————————————-


কাব্য সংকলনের পদসংখ্যা 

সুকুমার সেনের দেওয়া তথ্য-অনুযায়ী ১৫টি প্রকাশিত ও ৬টি নতুন পদ নিয়ে মোট ২১ টি পদের সংকলন হিসেবে ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ প্রকাশিত হয় ১১৯১ বঙ্গাব্দে (১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে)। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিক সংস্করণে এই কাব্য সংকলনের ২০ টি কবিতা ছাপা হয়েছে।
যাইহোক কাব্য সংকলনের কোনো পদেরই রচনাকালের উল্লেখ নেই।

ভারতী’তে যে পদটি প্রথম প্রকাশিত হয় তার কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধৃত হলো —

সজনি গো
শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা
নিশীথ যামিনী রে ।
কুঞ্জপথে সখি, কৈসে যাওব
অবলা কামিনী রে।………… ১৩ নং পদ


এছাড়াও
২. 

মরণ রে
তুহুঁ মম শ্যাম সমান।
মেঘবরণ তুঝ, মেঘ জটাজুট।
রক্তকমল কর, রক্ত অধর-পুট
তাপ-বিমোচন করুণ কোর তব
মৃত্যু অমৃত করে দান
তুহুঁ মম শ্যাম সমান।….. ১৯ নং


৩.

কো তুহুঁ বোলবি মোয়।
হৃদয়-মাহ মঝু জাগসি অনুখন,
আঁখ উপর তুহুঁ রচলহি আসন
অরুণ নয়ন তব মরম সঙে মম
নিমিখ ন অন্তর হোয়।
কো তুহুঁ বোলবি মোয়।…… ২০ নং

আরো পড়ুন :  রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ-এর বঙ্গভাষাভিধান, বাংলা ভাষার প্রথম অভিধান


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *