সাধনা পত্রিকা



শব্দচাবি – সাধনা পত্রিকার জন্ম, সম্পাদক, রবীন্দ্রনাথ, প্রথম সংখ্যার সূচি

রবীন্দ্রনাথ লেখক হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি যেমন বিভিন্ন ধরনের পত্রিকায় লিখতেন তেমনি বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে সম্পাদনাসূত্রে। পারিবারিক সূত্রেই তিনি উৎসাহিত এই সব ব্যাপারে। এই ধরনের কাজের দায়িত্ব নিতে দেখেছেন ঠাকুরবাড়ির অনেককেই। ফলস্বরূপ তাঁকেও একাজে বেমানান কখোনো মনে হয়নি।

সাধনা পত্রিকার প্রকাশ

১২৯৮ বঙ্গাব্দের [১৮৯১ খ্রি] অগ্রহায়ণ মাসে ঠাকুরবাড়ির তরুণদের উদযোগে প্রকাশিত হয় সাধনা পত্রিকা। পত্রিকাটি একটি মাসিক পত্রিকা ছিলো। সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথের  বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের ৪র্থ পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও সুধীন্দ্রনাথকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় ‘রবিকা’।
প্রথম সংখ্যা প্রকাশ পেলে রবীন্দ্রনাথ শ্রীশচন্দ্রকে চিঠিতে জানান,

সাধনা প্রথম সংখ্যা কি তোমার হস্তগত হয়েছে ? আমার ত সবশুদ্ধ মন্দ লাগল না। কিন্তু এর আরো উন্নতি করা আবশ্যক।

সাধনার উন্নতি সাধনে রবীন্দ্রনাথ কী করেছিলেন তার পরিচয় পরে দেয়া হবে। যাইহোক প্রথম সংখ্যাতেই রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখা প্রকাশ পেয়েছিল। সুধীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ৩ বছর পত্রিকাটি প্রকাশিত হলো। পরের বছর সম্পাদক হলেন রবীন্দ্রনাথ।

সাধনার নিয়মিত গ্রাহক

সাধনা পত্রিকা বিশেষত নিয়মিত গ্রাহকদের টাকাতেই চলতো, বাড়তি বিক্রি বলতে তেমন কিছু ছিল না। যাইহোক নিয়মিত গ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,  জগদিন্দ্রনাথ রায়, রজনীকান্ত সেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ।


রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনার দায়িত্বগ্রহণ

১৩০১ বঙ্গাব্দে ভাইপো তথা সাধনা-সম্পাদক সুধীন্দ্রনাথ বিবাহ করলেন। ফলতঃ সাধনার প্রতি তাঁর মনোযোগের অভাব পরিলক্ষিত হলো। তাছাড়া সেসময় সুধীন্দ্রনাথ আইনি ব্যবসার জন্যে কোর্টে যেতে শুরু করলেন।

আরো পড়ুন :  সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম
সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ
সর্বশেষে ১৩০১ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে সাধনা পত্রিকা রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো। কোনো পত্রিকা সম্পাদক হিসাবে এই তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাময়িকপত্রের সম্পাদক রূপে তাঁর ভূমিকা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পাদনাকর্মে তাঁর চোখের সামনে যিনি আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তিনি হলেন ‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ। বঙ্কিমের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ সাধনাতেই শোকপ্রস্তাব রচনা করেছিলেন।

আরো পড়ুন – রবীন্দ্র উপন্যাসের ইংরাজি অনুবাদ


উদযোগ গ্রহণ

সম্পাদক হিসাবে রবীন্দ্রনাথ সাধনার উন্নতিসাধনে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, সেগুলি উল্লেখ করা হলো-

১) পত্রিকার আকৃতি পরিবর্তন করা।
২) গ্রাহক মূল্য বাড়িয়ে দেয়া।
৩) বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কার্যাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেন।
৪) সূচিপত্রে লেখকের নাম দেয়ার পদ্ধতি তুলে দেন।

রবীন্দ্রনাথের সুসম্পাদনায় সাধনা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠতে লাগলো। সাধনা ছিল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় পত্রিকা। একে তিনি হাতের কুঠারের সঙ্গে তুলনা করেছেন,

সাধনা আমার হাতের কুঠারের মতো, আমাদের দেশের বৃহৎ সামাজিক অরণ্য ছেদন করবার জন্য একে আমি ফেলে রেখে মরচে পড়তে দেব না — একে আমি বরাবর হাতে রেখে দেব।….  আমার সহায়কারী পাই তো ভালোই,  না পাই তো কাজেই আমাকে একলা খাটতে হবে।

ছিন্নপত্রাবলী, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩
[ স্মরণে রাখবেন তখনো কিন্তু সুধীন্দ্রনাথই সম্পাদনার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ]

এইসব লক্ষ করে গবেষকরা মনে করেন সাধনার মূল কাণ্ডারি তিনিই –

আমাদের বক্তব্য তিন বৎসরের পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে সুধীন্দ্রনাথের নাম মুদ্রিত হলেও সাধনার মুখ্য পরিচালক বা সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং।

অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য

এছাড়া পূর্বোক্ত পত্রে তিনি লিখছেন,

আমি নিশ্চয় জানি ‘আমার সাধনা কভু না নিষ্ফল হবে’।

এ থেকে সমালোচকদের কৃত সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অসুবিধা হয় না।

ব্যর্থতা

আরো পড়ুন :  সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্র ছোটোগল্প
সুধীন্দ্রনাথের সময়ে সাধনা যে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথের শত চেষ্টাতেও সাধনা সেই সংকট থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি। আর্থিক সংকট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাতেই আগামী সংখ্যার মূল্য আগাম পাঠানোর উল্লেখ করেন। কিন্তু বিধি বাম এতেও কোনো সুরাহা হলো না। পত্রিকাটিকে বাঁচাতে রবীন্দ্রনাথ পত্রিকাটিকে ত্রৈমাসিক হিসাবে প্রকাশ করার কথা ভাবলেন। এ নিয়ে ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি রবীন্দ্রনাথকে সাধুবাদ জানান। তবুও পত্রিকা-বন্ধে রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ হলেন।

শেষসংখ্যা ও প্রকাশবন্ধ

১৩০২ বঙ্গাব্দে সাধনা  ভাদ্র-আশ্বিন-কার্তিক এই তিন মাসের সম্মিলিত সংখ্যা হিসাবে প্রকাশ পেল। আর এটিই ছিলো সাধনা’র শেষ সংখ্যা।

শেষসংখ্যা সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য

১। পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ২৫৬।
২। প্রকাশিত হলো রবীন্দ্রনাথের ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ ; দ্বিজেন্দ্রলালের ‘আমরা ও তোমরা’ ; অক্ষয়কুমার মৈত্রের ‘সিরাজদৌল্লা’ ইত্যাদি।

সাধনায় প্রকাশিত ‘বিদ্যাসাগর চরিত’

অনেক সাহিত্যমোদী ব্যক্তি সাধনার বন্ধে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এখানে ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতির বক্তব্য তুলে ধরা হলো,

সহসা সাধনার বিলোপ হইল দেখিয়া আমরা অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি।…  বাঙালি পাঠকের সম্পূর্ণ সহানুভূতি পাইলে সাধনা বিলুপ্ত হইত না। যে দেশে সাধনার মত উচ্চশ্রেণীর মাসিকও বিলুপ্ত হইবার অবকাশ পায়, সে দেশ নিশ্চয়ই  অত্যন্ত দুর্ভাগা।


সাধনার প্রথম সংখ্যার সূচি [অগ্রহায়ণ ১২৯৮]

১। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
 -সাধনার সূর্যালোক (প্রবন্ধ)

আরো পড়ুন :  রবীন্দ্র-জীবনের শেষ বৎসর, শান্তিদেব ঘোষ
২। ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর
 – শকুন্তলা (কবিতা)

৩। বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর
– ঋতুসংহার (প্রবন্ধ)
– জানালার ধারে

৪। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর
– প্রাণ ও প্রাণী (প্রবন্ধ)

৫। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
-স্বার্গম স্বরলিপির আকারমাত্রিক নূতন পদ্ধতি (প্রবন্ধ) – স্ত্রী-পুরুষের ভেদাভেদ (প্রবন্ধ)
৬। সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর
-সোরাব ও রুস্তম (গল্প)

৭। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন (গল্প)
– বাগান (প্রবন্ধ)
– যাত্রা আরম্ভ/য়ুরোপবাসীর ডায়ারী  (পত্র)
৮। সাময়িক সারসংগ্রহ (বিভাগীয় রচনা)

– মণিপুরের বর্ণনা
– আমেরিকার সমাজচিত্র
– পৌরাণিক মহাপ্লাবন
– মুসলমান মহিলা
– প্রাচ্য সভ্যতার প্রাচীনত্ব

৯। বৈজ্ঞানিক সংবাদ (বিভাগীয় রচনা)

– গতি নির্ণয়ের ইন্দ্রিয়
– ইচ্ছামৃত্যু
– মাকড়সা সমাজে স্ত্রীজাতির গৌরব
– উটপক্ষীর লাথি

১০। সাময়িক সাহিত্য-সমালোচনা (বিভাগীয়)

– ভারতী [আশ্বিন ও কার্তিক ১২৯৮]
– নব্যভারত [আশ্বিন ও কার্তিক ১২৯৮]
– সাহিত্য [আশ্বিন ও কার্তিক ১২৯৮]
[৮নং – ১০নং সমগ্র বিভাগীয় রচনা রবীন্দ্রনাথের লেখা]

সাহায্য – প্রবীরকুমার বৈদ্য / অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *