রবীন্দ্র-জীবনের শেষ বৎসর

রবীন্দ্র-জীবনের শেষ বৎসর, শান্তিদেব ঘোষ

গুরুদেবের জীবনের শেষ বৎসরটিকে নানা জনে নানা দিক থেকে দেখেছেন, এবং লোকসমক্ষে তাঁর এই দিনগুলির বিবরণ প্রকাশ করে দেখিয়েছেন। জীবনের আরম্ভ থেকেই গুরুদেবকে আমরা পেয়েছি সব সময় আমাদের মধ্যে, কিন্তু তখন খুব নিকট থেকে তাঁকে বোঝবার শক্তি হয়নি। যখন বড়ো হয়ে উঠলাম, তখন থেকেই তাঁর সহচর্য পেতে লাগলাম। আমাকে তৈরি করতে লাগলেন তাঁর বহুবিধ কর্মজীবনের একদিকে আমাকে চালনা করবার ইচ্ছায়। তাঁর সৃষ্টি নাচগান অভিনয় উৎসবের কাজে তিনি আমাকে লাগিয়েছেন। এ দিক থেকে তাঁর জীবনের শেষ বৎসরটি কীভাবে কেটেছিল তারই একটু পরিচয় দিতে চেষ্টা করব।

তিনি ছিলেন চিরকাল গানে পাগল, গান গেয়েছেন, রচনা করেছেন, সকলকে গাইয়েছেন। কিন্তু শেষদিনকার অসুস্থতার সময় তাঁর শ্রবণশক্তি কমে এসেছিল বলে গান শুনতেও বাধা হত; গানরচনা করতে আর উৎসাহ পেতেন না, কিন্তু শোনবার জন্য উৎসুক হয়ে থাকতেন। ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে প্রায়ই সন্ধ্যার অবসরে তাঁকে গান শোনাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে, নিজেও গেয়েছি, সব সময় আনন্দ দিতে পেরেছি কি না জানি নে।

নিজের থেকে গান শোনাবার ইচ্ছা প্রকাশ করতে তিনি সংকোচ বোধ করতেন। তাঁর চিরকালেরই স্বভাব ছিল নিজের সুবিধার জন্য অপরের সাহায্য না নেওয়া। নিজের দৈহিক সেবার জন্য সুস্থশরীরে অপরের সাহায্য গ্রহণ করা গুরুদেবের পক্ষে অসম্ভব ছিল। আমাদের শিশুবয়সে তাঁকে দেখেছি নিজের কাজ প্রায় নিজে করেছেন; তখন তাঁর সেবায় নিযুক্ত থাকত মাত্র একটি ভৃত্য। পাছে নিয়মিত গান শোনাবার দায়িত্বে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি এ আশঙ্কায় তিনি বলতেন, ‘তোদের যখন সুবিধা হয় আসিস।’ আমরা তখন তাঁর ইচ্ছামত হয়তো তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি। নানাপ্রকার বাধা পড়েছে তাতে–তাঁর ইচ্ছার প্রতি তখন গুরুত্ব দিইনি। তাঁর মৃত্যুর পরে সে ভুল বুঝেছি।

তাঁর কাছে গাইবার জন্যে ফরমাস পেতুম তাঁর যৌবনে রচিত গানগুলি থেকে, সেইগুলিই তখন ছিল তাঁর খুব প্রিয় গান। তারই কয়েকটি গানের উল্লেখ এখানে করি : ‘আমার প্রাণের ‘পর চলে গেল কে,’ ‘মরি লো মরি,’ ‘তোমার গোপন কথাটি’, ‘কাঙাল আমারে কাঙাল করেছ’, ‘হেলাফেলা সারা বেলা’, ‘আমার পরান লয়ে কি খেলা খেলবে’, ‘বড় বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে’, ‘আমার মন মানে না’, ইত্যাদি। প্রায়ই বলেছেন, এই সময়ের গানগুলি তাঁর মনে যে ভাবে চিহ্ন রেখে গেছে এমনটি জীবনের পরবর্তী কালে রচিত গানে হয়নি। ইদানীংকার গান আমাদের মুখে শুনে তাঁর অনেক সময় নতুন ঠেকত, পরিহাস করে বলতেন, ‘এ কি আমারই রচনা, আমি তো মনেই করতে পারি না যে কবে আমি এ গান রচনা করেছি। তবে শুনে মনে হচ্ছে যেন আমারই।’ পুরানো গানগুলির প্রসঙ্গে প্রথম-যৌবনের সেই-সব দিনের বর্ণনা করতেন। বলতেন, কি রকম ক্ষ্যাপার মতো এ-সব গান গেয়ে তাঁর সময় কাটত। সেদিনের কলকাতা এত শব্দমুখর ছিল না, বিজলীবাতির রোশনাইও তখন জ্যোৎস্নাকে আচ্ছন্ন করেনি। এই রকমের পূর্ণিমারাত্রে, পাতলা একখানা উড়ানি গায়ে গ্রীষ্মের দক্ষিণ বাতাসে তেতলার ছাদে পায়চারি করেছেন, একলা অনেক রাত পর্যন্ত-চারিদিকে শুভ্র জ্যোৎস্না, চাদরের এক কোণে বাঁধা থাকত বেলফুলের কুঁড়ি। তখন গান গেয়েছেন প্রাণ খুলে, সমস্ত পাড়া সেই গানে গমগম করে উঠত। তিনি বলতেন, সেই গলা একবার পেয়ে আবার হারানোর মতো দুঃখ আর কিছু হতে পারে না।

রোগশয্যায় গান শোনাবার সময় নানা বিষয়ে অল্পবিস্তর আলাপ- আলোচনা হত তাঁর সঙ্গে। ছোটবেলাকার কত রকমের গান গেয়ে শোনাতেন, তাঁর গুরু বিষ্ণুর শেখানো গ্রাম্য ছড়ার গান, তারই দু’ একটি তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর ‘ছেলেবেলা’য়। আলোচনা-প্রসঙ্গে এটুকু বুঝেছি যে, তিনিও মনে করতেন তাঁর সাহিত্য নিয়ে যতখানি আলোচনা হয়েছে তাঁর গান নিয়ে ততখানি আলোচনা এখনো হয়নি। তাঁর গানে যে আলোচনা করবার বিষয় আছে সেটা তিনি অনুভব করতেন, কিন্তু নিজের রচনার সম্বন্ধে স্বাভাবিক সংকোচবশত নিজের গানের বিষয় নিয়ে খুলে আলোচনা করেননি একেবারেই। তাঁর গান ভারতীয় সংগীতে কতখানি নূতনত্ব বা বৈশিষ্ট্য এনেছে খুঁটিয়ে তা তিনি ভাবেননি, কিন্তু এটুকু জানতেন যে, সব মিলিয়ে তাঁর গানে এমন কিছু তৈরী হয়েছে যার থেকে বর্তমান রচয়িতারা যেভাবে সাহায্য পাচ্ছে ভবিষ্যৎ যুগেও তা পাবে। বিস্তারিত আলোচনা হলে এ শক্তি কতদুর, এর স্থান কোথায় সে কথা বোঝা যাবে, এইজন্যেই তিনি আলোচনা হোক তাই চাইতেন।

আরো পড়ুন :  রামকিঙ্কর বেইজ, অভিনব শিল্পরূপের উদ্ভাবক, মনসিজ মজুমদার

যে-কারণেই হোক তাঁর মনে ধারণা হয়েছিল যে, গানবাজনায় আগেকার মতো মাথা তাঁর খোলে না। গানরচনার কথা উঠলেই বলতেন, ‘তুই তো বলিস, কিন্তু সে শক্তি কি আর আমার আছে, গলা দিয়ে সুর বেরুতে চায় না।’ এই রকম মানসিক অবসাদের ভিতরেও তিনি গান রচনার উৎসাহ সম্পূর্ণ নিরুদ্ধ করে রাখতে পারেননি। কয়েকটি গান রচিত হয়েছিল, কিন্তু পূর্বের মতো গানের সে প্রবাহ আর দেখা দেয়নি। সুরযোজনা করা ও সেই সুর মনে করে শেখানোতে যে পরিশ্রম হয় তার অর্ধেক পরিশ্রম কবিতারচনায় তাঁর হত না। তাই কবিতার স্রোত শেষ পর্যন্ত অবারিত ছিল। রোগশয্যায় যখন নিজের হাতে লিখতে পারতেন না তখন প্রায়ই অতি প্রত্যুষে ঘুম ভাঙত তাঁর নূতন কবিতা-আবৃত্তির সঙ্গে, সেবক-সেবিকারা প্রস্তুত হয়ে থাকতেন সে কবিতা লিখে রাখবার জন্যে।

যদিও তিনি বলতেন তাঁর গানের বুদ্ধি হারিয়েছে, কিন্তু সেই বৎসর পৌষমাসে যে-কয়টি গান রচনা করেছিলেন, তার ভিতরে সুরযোজনা-ক্ষমতার কিছু অভাব ঘটেছিল বলে আমার মনে হয় না। বলেছেন–গলার সুর খেলে না, অথচ গানে সুর যে-পর্যন্ত ওঠানামা করছে, তাতে আগের দিনের গানের তুলনায় অকৃতকার্যতার পরিচয় নেই। ‘উর্বশী’ কবিতাটি অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে একটি সুন্দর গানে পরিণত হল। গানে সুরযোজনা করতে তাঁর কষ্ট হত বুঝতাম, যখন দেখতাম উঁচুতে সুর তুলে মাঝে মাঝে দুর্বলতার জন্য তার কণ্ঠ অকৃতকার্য হত। জানি না আমারই ভ্রম কি না। মনে হত যেন সেই না-পারার বেদনা তিনি বিশেষভাবে গোপন করতে চাইছেন। কখনো বলে উঠতেন ‘সুরটা বুঝতে পেরেছিস তো, ঠিক করে নিস।’ তখন ভেবেছি, যিনি সমস্ত জীবন এত গাইলেন, এত রচনা করলেন, যাঁর কণ্ঠের গান শোনবার জন্যে এক সময় কত লোকেই না পাগল হয়েছে, আজ সেই মহাপুরুষের এ কি বিড়ম্বনা, অন্তরে গানের প্রেরণা সতেজ, কিন্তু কণ্ঠে নেই সেই সুর, সেই শক্তি। এই জন্যেই আগেকার মতো গানরচনা করার কথা বলে তাঁকে দুঃখ দিতে কষ্টবোধ হত, তাঁকে গান শোনাতে গিয়ে বিশেষ ভাবনা হত যখন তিনি আনন্দে নিজেই গান গেয়ে উঠতেন। অল্পক্ষণ গেয়ে বার্ধক্যকম্পিত রোগদুর্বল কণ্ঠ শ্রান্ত হয়ে পড়ত। যেদিন শরীর ও মন অপেক্ষাকৃত সবল থাকত সেদিন হয়তো আরো বেশিক্ষণ আপন মনে সেই-সব আগেকার দিনের গান গেয়েছেন-কখনো ব্রহ্ম-সংগীত, কখনো হিন্দী গানের কয়েকটা লাইন, কখনো বিনা কথায় কেবল সুর ভেজেছেন, আবার কখনো নিজের রচিত, পুরোনো গান গেয়েছেন, শুনে বোঝা যেত আজকে তাঁর শরীরমন সুস্থ আছে। পরিহাসচ্ছলে দৌহিত্রী শ্রীমতী নন্দিতা দেবীকে দেখিয়ে বলতেন, ‘গাইতে লজ্জা হয়, পাছে ওরা সব আড়ালে হাসে, আমার বেসুরো গলার গান শুনে।’

অসুস্থ শরীরে অভিনয় ও নাচগানের মহড়ায় তিনি যোগ দিতে পারতেন না, কিন্তু মন তাঁর সব সময় থাকত সেইদিকে। ১৩৪৭ সালের পৌষমাসে ‘শাপমোচন’ অভিনীত হল, সেই অসুস্থতার মধ্যে নাটকের অদলবদল করে, নতুন কথা বসিয়ে, গানরচনা করে, তবে নিশ্চিন্ত হলেন। মহড়ার সময় পাশের ঘর থেকে শুনতে চেষ্টা করতেন কি রকম হচ্ছে গানবাজনা। সেখানে এসে আমাদের মধ্যে বসে সেই মহড়ায় যোগ দিতে না পারায় তাঁর মনে অস্বস্তি হত খুব। অভিনয়ের চেয়ে প্রতিদিনের মহড়াতেই তিনি বেশি আনন্দ পেতেন। ধীরে ধীরে একটা সৃষ্টি কেমন করে চোখের সামনে গড়ে উঠছে তা দেখে তিনি আনন্দ পেতেন। কোনদিন হয়তো নিজেই এসে উপস্থিত হতেন রিহার্সলের আসরে। অভিনয়ের দিন তাঁকে আগেই বলে রাখা হত, এতটুকু ক্লান্তি বোধ করলেই যেন বলেন তাঁকে ঘরে নিয়ে যেতে, কিন্তু সম্ভব হত না। দেহের শক্তিতে না কুলোলেও জোর করে বসে থাকতেন শেষ পর্যন্ত।

আরো পড়ুন :  রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ-এর বঙ্গভাষাভিধান, বাংলা ভাষার প্রথম অভিধান

১৩৪৮ সালের নববর্ষে আমরা নাচ-গান ইত্যাদির আয়োজনে ব্যস্ত, কারণ গত কয়েক বৎসর ধরে নববর্ষে গুরুদেবের জন্মতিথি পালিত হচ্ছে ও সেই উপলক্ষে উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। দিন তিন-চার পূর্বে সন্ধ্যায় তাঁর কাছে গিয়েছি, বারান্দায় বসে তাঁকে কিছু গান শোনানোর পর শ্রীযুক্ত অমিয় চক্রবর্তী এলেন। তাঁকে দেখে নববর্ষে অভিভাষণ ‘সভ্যতার-সংকট’-এর বিষয়-বস্তুটি গুরুদেব মুখে বর্ণনা করে গেলেন।…

মনে ভাবলুম গুরুদেব লিখে দেশকে নববর্ষের বাণী পাঠাচ্ছেন অথচ গানে কোনো বাণী দেবেন না তা হতে পারে না। পরের দিন গিয়ে বললাম, ‘নববর্ষের প্রভাতে বৈতালিকের জন্য একটি নতুন গান রচনা করতে কি আপনার কষ্ট হবে?’ প্রথমে আপত্তি করলেন, কিন্তু আমার আগ্রহ দেখে তা বন্ধ রাখতে পারলেন না। বললেন, ‘সৌম্য (সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর) আমাকে বলেছে মানবের জয়গান গেয়ে একটা কবিতা লিখতে। সে বলে আমি যন্ত্রের জয়গান গেয়েছি, মানবের জয়গান করিনি। তাই একটা কবিতা রচনা করেছি, সেটাই হবে নববর্ষের গান।’ কাছে ছিলেন শ্রীযুক্তা মৈত্রেয়ী দেবী তিনি গুরুদেবের খাতা খুলে কবিতাটি কপি করে আমাকে দিলেন। কবিতাটি ছিল একটু বড়ো, দেখে ভাবতাম এত বড়ো কবিতায় সুরযোজনা করতে বলা মানে তাঁকে কষ্ট দেওয়া। সুর দেবার একটু চেষ্টা করে সেদিন আর পারলেন না, বললেন, ‘কালকে হবে’। পরের দিন সেই কবিতাটি সংক্ষেপ করতে করতে শেষপর্যন্ত, বর্তমানে ‘ঐ মহামানব আসে’ গানটি যে আকারে আছে, সেই আকারে তাকে পেলাম।…

১৩৪৮ সালের ২৫শে বৈশাখ গুরুদেবের জন্মোৎসব নিয়ে সমস্ত বাংলাদেশ যখন মেতে উঠল, সেই উপলক্ষে কলকাতার একটি কর্তব্য সেরে এসে আমার চট্টগ্রামে আর-একটি কর্তব্য সম্পাদনের জন্য রওনা হবার কথা। শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে গুরুদেবের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, পঁচিশে বৈশাখের দিন এখানে কি হবে। কথাবার্তায় বুঝলাম সেই জন্মদিন উপলক্ষ করে নৃত্যগীত ইত্যাদির আয়োজন হোক এই তাঁর ইচ্ছা। জন্মদিনের আগে একদিন সন্ধ্যায় প্রশ্ন করি, “উৎসবের সময় ‘আবার যদি ইচ্ছা কর আবার আসি ফিরে’ গানটি কি গাইব?” তাঁর জন্মদিনের গানের কথা তাঁকে জিজ্ঞাসা করাতে আপত্তি করে বললেন, ‘তুই বেছে নে, আমার জন্মদিনের গান আমি বেছে দেব কেন।’ একটু পরে ‘মহামানব আসে’ গানটির প্রসঙ্গে অনেক কথা বলে গেলেন। কথার ভাবে বুঝেছিলাম যে, দেশ তাঁকে সম্পূর্ণ চিনল না এই অভিমান তখনো তাঁর মনে রয়েছে। বলেছিলেন, ‘আমি যখন চলে যাব তখন বুঝবে দেশের জন্য কি করেছি।’ খানিকক্ষণ নীরব হয়ে থেকে ‘সার্থক জনম আমারা জন্মেছি এই দেশে’ গানটি প্রাণের আবেগে গেয়ে উঠলেন। বুঝলাম দেশ তাঁকে বুঝতে পারেনি এ অভিমান যতই থাকুক না কেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তাঁর কোনোদিন কমতে পারে না।

পরের দিন সকালে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘আপনি নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কবিতা লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, অথচ একটা গান রচনা করলেন না এটা ঠিক মনে হয় না। এবারের পঁচিশে বৈশাখে সমস্ত দেশ আপনার জন্মোৎসব করবে, এই দিনকে উপলক্ষ করে একটি গান রচনা না হলে জন্মদিনের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয় না।

আরো পড়ুন :  সংগ্রামী রাসবিহারী বসু ও এক জাপানি কন্যার প্রেমকথা, কল্যাণ চক্রবর্তী

শুনে বললেন, ‘তুই আবার এক অদ্ভুত ফরমাস এনে হাজির করলি। আমি নিজের জন্মদিনের গান নিজে রচনা করব, লোকে আমাকে বলবে কি। দেশের লোক এত নির্বোধ নয়, ঠিক করে ফেলবে যে, আমি নিজেকে নিজেই প্রচার করছি। তুই চেষ্টা কর এখানে যাঁরা বড়ো বড়ো কবি আছেন, তাঁদের দিয়ে গান লেখাতে। বলেই তাঁদের নাম বলতে শুরু করলেন। আমি হাসতে লাগলাম, তিনি বললেন, ‘কেন তাঁরা কি কবিতা লিখতে পারেন না মনে করিস্ ?’ উত্তরে বললাম, ‘আপনি থাকতে অন্যদের কাছে চাইবার কি প্রয়োজন-যখন জন্মদিনের কবিতা লিখেছিলেন তখন কেউ কি আপনাকে দোষী করেছিল?’ রাজী হয়ে জন্মদিনের কবিতাগুলি সব খুঁজে আনতে বললেন দপ্তর থেকে। ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটির ‘হে নূতন দেখা দিক আরবার’ অংশটি একটু অদলবদল করে সুর যোজনা করলেন। সেদিন ২৩ বৈশাখ। পরের দিন সকালে পুনরায় গানটি আমার গলায় শুনে শুনে বললেন, ‘হ্যাঁ এবার হয়েছে।’

সেদিন একথা ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি এই তাঁর জীবনের সর্বশেষ গান।…

এই জন্মোৎসবের রাত্রে সর্বক্ষণ তিনি নাচগান-অভিনয়ে আনন্দের সঙ্গেই যোগ দিয়েছিলেন এবং শেষপর্যন্ত বসে ছিলেন।

এখানকার জন্মোৎসব শেষ করে পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে ঘুরে এসে শুনলুম গুরুদেব আমার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি চান যত তাড়াতাড়ি হোক সংক্ষেপে বর্ষামঙ্গলের আয়োজন করি, কারণ এ অঞ্চলে বর্ষা এ বছর ইতিমধ্যেই বিপুল সমারোহে দেখা দিয়েছিল, তাঁর মনও তাই চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। শান্তিনিকেতনে সকলে জড়ো হবার আগেই বর্ষামঙ্গল করবার অসুবিধা ছিল, তাই মনে করেছিলাম কয়েক দিন অপেক্ষা করে আয়োজন করা যাবে। এর মধ্যেই একদিন সন্ধ্যায় বর্ষার ঘনঘটায় গুরুদেবের মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, তাই কিছু বর্ষার গান তাঁকে শোনালাম। বর্ষার সঙ্গে তাঁর মনের যে কি যোগ ছিল জানি না, কিন্তু বার বার দেখেছি, বর্ষার দিনে তিনি যেরকম চঞ্চল হয়ে উঠতেন সাধারণ মানুষের মধ্যে তা বিরল।

রবীন্দ্র-জীবনের শেষ বৎসর
“রবীন্দ্র-জীবনের শেষ বৎসর” অংশটি এই মূল গ্রন্থের অংশবিশেষ

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বর্ষার গান রচনা করতে তাঁর ইচ্ছা করে কি না! বলেছিলেন, ‘ইচ্ছা থাকলেও পেরে উঠব না, গলায় সে শক্তি নেই, ভাবতে পারি না।’ এই সময় থেকে তাঁর অসুস্থতা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছিল। তবু এত শীঘ্র যে তিনি লোকান্তরিত হবেন আমরা অনেকেই তা কল্পনাও করিনি। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল কলকাতায়, আর ফিরলেন না। তখন মনে হল, হয়তো এই জন্যে তিনি বর্ষামঙ্গল করবার জন্যে এত চঞ্চল হয়ে উঠেছিলেন। অন্তরে মৃত্যুর ডাক শুনেছিলেন নিশ্চয়ই, বুঝেছিলেন এমন বর্ষার ঋতু এবার তাঁর কাছে বৃথাই যাবে যদি না সত্বর আয়োজন হয়-আমরা তাঁর সে ইঙ্গিত ধরতে পারিনি। তাঁর তিরোধানের মাসখানেক পরে যখন বর্ষামঙ্গলের আয়োজন করলাম, তখন কেবল এই কথাই মনে করেছি, তাঁর ইচ্ছা তখন পূরণ করতে পারিনি, আজ তিনি যে লোকেই থাকুন যেন আমাদের মধ্যে এই বর্ষামঙ্গলের আনন্দে যোগ দেন, এ উৎসব আমরা তাঁর উদ্দেশ্যেই করছি-যদি উৎসব সার্থক হয় বুঝব তিনি ছিলেন আমাদের মধ্যে, আমাদের অর্ঘ্য তিনি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।

[সংক্ষেপিত]॥ রবীন্দ্র-সংগীত ॥

[বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত “রবীন্দ্র স্মৃতি” থেকে সংগৃহীত]


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *