সরহপাদ



পরিচয়

পণ্ডিত তারানাথের সাক্ষ্য মতে সরহ সিদ্ধাচার্যগণের আদি। তিনি জাত্যা ব্রাহ্মণ এবং বেদাদি বিদ্যায় পারঙ্গম। জন্মস্থান উড়িষ্যা (Odivisa) তিনি নালন্দায় শিক্ষাগ্রহণ করেন। নালন্দায় তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন ধর্মকীর্তি হরিভদ্র। রাহুল সংকৃত্যায়ন বলেন, হরিভদ্র রাজা ধর্মপালের (৭৭০ – ৮১৫ খ্রি.) সমসাময়িক। সরহপাদের জীবৎকাল অষ্টম শতাব্দী। সম্ভবতঃ ৭৮০ খ্রি. তিনি পরলােক গমন করেন।সরহ আচার্য স্থবিরকালের নিকট অভিষিক্ত হন।


[ads id=”ads1″]


নামের উৎপত্তি 

দাক্ষিণাত্যে তিনি এক শরকারের (arrow-smith) কন্যাকে মুদ্রারূপে গ্রহণ করেন। তখন থেকে তাঁর নাম হয় শরহ বা সরহ। সরহের অপর নাম রাহুলভদ্র, সরােরুহ বা সরােজ বজ্র। রাহুল সংকৃত্যায়ন মনে করেন, তাঁর ভিক্ষুনাম রাহুলভদ্র। বজ্রযানের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে সরােরুহবজ্র বা সরােজ বজ্র ব্যবহার করা হয়। 

আরো পড়ুন :  প্রসঙ্গ পুথি ২য় পর্ব


বাস

রাহুল সংকৃত্যায়ন আরও বলেন, সরহ ‘পূর্বদিশার অন্তর্গত রাজ্ঞীনামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন ; যা বর্তমানে ভাগলপুরের অন্তর্গত। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, সরহ বরেন্দ্রভূমির লােক। তাঁর একটি চার বহিরঙ্গ অর্থ থেকে জানা যায়, তিনি বঙ্গে জায়া গ্রহণ করেছিলেন (চর্যা, ৩৯)। সরহের গানের প্রবাদ-প্রবচন ও বাগ্‌বিধি বিচার করলেও মনে হয়, সরহ গৌড়বঙ্গের অধিবাসী। তিনি রসসিদ্ধ নাগার্জুনকে সহজমতে অভিষিক্ত করেন।


অন্য পরিচিতি

তাঞ্জুর তালিকায় সরহকে বলা হয়েছে— ‘আচার্য’, ‘মহাচার্য’, ‘সিদ্ধ-মহাচার্য’, ‘মহাব্রহ্মণ’, যােগী, ‘মহাযােগী’, ‘যােগীশ্বর‘, এবং ‘মহাশবর। ‘শবরশব্দটি বজ্রযানে বজ্রধরের প্রতীক। 


রচনা

সরহের নামে সংস্কৃত, অপভ্রংশ এবং প্রত্নবাংলা—তিন ভাষাতেই রচনার নিদর্শন মেলে। অপভ্রংশ ভাষায় তিনি রচনা করেন অনেকগুলি দোহা ও দোহাজাতীয় গীতি। এগুলির ভিতর —

আরো পড়ুন :  চর্যাপদের কবি ২৪ নাকি ২৩?

  • দোহাকোষগীতি, 
  • ক-খ দোহা‘ 
  • মহামুদ্রোপদেশবজ্রগুহ্যগীতি
  • কায়-বাক-চিত্তঅমনসিকার‘, 
  • ডাকিনীগুহ্যগীতি প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। 

সরহের দোহা নানাবিধ শাস্ত্রজ্ঞানের পরিচায়ক। ব্রহ্ম, ঈশ্বর, অর্হৎ, বৌদ্ধ, জৈন, লােকায়ত ও সাংখ্যমত খণ্ডন করে তিনি সহজমতের সারবত্তা ঘােষণা করেছেন।

সংস্কৃতেও তিনি কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। 

  • বুদ্ধকপালসাধন‘, 
  • ‘হেবজ্রতন্ত্রপঞ্জিকা প্রভৃতি গ্রন্থ উল্লেখযােগ্য। 

চর্যাটীকাতেও সরহের সংস্কৃত রচনার অংশ উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর বহু শ্লোক টীকাতে উদ্ধৃত হয়েছে।

চর্যাগীতিতে সরহের ৪টি গান (২২, ৩২, ৩৮, ৩৯) সঙ্কলিত হয়েছে

  1. অপণে রচি রচি ভব নিবাণা [২২]
  2. নাদ ন বিন্দু ন রবি ন সসি মণ্ডল [৩২]
  3. কাঅ ণাবড়ি খান্টি মণ কেড়ুআল [৩৮]
  4. সুইণা হ অবিদা রম রে ণিঅমণ তোহোরেঁ দোসেঁ [৩৯]
আরো পড়ুন :  চর্যাপদের সন্ধ্যাভাষা কি অশ্লীল?


প্রত্যেকটি গান সিদ্ধাচার্যের ভাব-স্বরূপ পরিজ্ঞানের পরিচয়বহ।  সরহ নিজেকে বলেছেন, অচিন্ত্য যােগী (অচিন্ত জোই’—২২)।


[ads id=”ads2″]


আলোচনা

কবি-স্বভাব অপেক্ষা আচার্য-সুলভ স্বভাবই সরহের গানে প্রকাশিত। একটি গানে (৩৮) তিনি নৌবাহনের রূপক গ্রহণ করেছেন। বঙ্গে প্রচলিত বিশিষ্টার্থক বাক্য প্রয়ােগে সরহের বাকপটুতার পরিচয় মেলে, যা লােকজ্ঞানের পরিচয়ও বহন করে। ৩৯ সংখ্যক গানে দীর্ঘ মাপের মাত্রাছন্দে ভঙ্গপদী চরণের প্রয়ােগ ছন্দ-বৈচিত্র্য এনেছে।

 



————————————–

সাহায্য : জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী 

————————————–


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *