সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল কথাকার, যাঁর রচনার শরীরে মিশে আছে রাঢ় বাংলার ধুলো-মাটি-অন্ধকার আর আত্মার গভীরে প্রোথিত আছে বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী দর্শন। ১৯৩০ থেকে ২০১২—এই দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চা বাংলা গদ্যের ইতিহাসে এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছে।
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের জীবন, সাহিত্যদর্শন এবং তাঁর কথাসাহিত্যে ব্রাত্যজনদের বিবর্তনমূলক বিশ্লেষণ
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল কথাকার, যাঁর রচনার শরীরে মিশে আছে রাঢ় বাংলার ধুলো-মাটি-অন্ধকার আর আত্মার গভীরে প্রোথিত আছে বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী দর্শন। ১৯৩০ থেকে ২০১২—এই দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চা বাংলা গদ্যের ইতিহাসে এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছে। তিনি কেবল এক জন গল্পকার বা ঔপন্যাসিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক জন তীক্ষ্ণ সমাজ-পর্যবেক্ষক ও নৃবিজ্ঞানী, যিনি রাঢ়ের রুক্ষ মাটির আদিম প্রবৃত্তি থেকে শুরু করে আধুনিক রাজনীতির জটিল গোলকধাঁধা পর্যন্ত বিস্তৃত এক ক্যানভাসে মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে তুলে ধরেছেন। বিশেষত, তাঁর রচনায় ব্রাত্য বা প্রান্তিক মানুষের উপস্থিতি কেবল সহমর্মিতার স্তরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে অস্তিত্বের এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ।
জীবন ও সময়: প্রস্তুতিকাল এবং বিবর্তনের তিনটি পর্যায়
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সাহিত্য-মানস বুঝতে হলে তাঁর জীবনের বিচিত্র পথচলার দিকে দৃষ্টিপাত করা অপরিহার্য। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, বিষয় নির্বাচন এবং শৈল্পিক প্রবণতার নেপথ্যে যে পরিপ্রেক্ষিত থাকে, তা তাঁর জীবনেরই অভিজ্ঞতার ফসল 1। সিরাজের দীর্ঘ ৮২ বছরের জীবনকে গবেষকেরা প্রধানত তিনটি পর্বে বিভক্ত করেছেন।
প্রথম পর্যায়: বোহেমিয়ান জীবন ও লোকসংস্কৃতির পাঠশালা (১৯৩০-১৯৫৬)
মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার খোশবাসপুর গ্রামটিই ছিল সিরাজের আঁতুড়ঘর। ১৪ অক্টোবর ১৯৩০ সালে এক শিক্ষিত ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবারে তাঁর জন্ম 1। সিরাজের শৈশব ও কৈশোর ছিল বৈচিত্র্যময়। তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুর রহমান ফেরদৌসী ছিলেন রাজনৈতিক ভাবে সচেতন এবং এক জন গভীর সাহিত্যপ্রেমিক। সিরাজের নিজের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে যে, জন্মের পর চোখ খুলেই তিনি চারদিকে কেবল বইয়ের স্তূপ দেখেছেন—আরবি, ফারসি এবং উর্দু ভাষার বিশাল সব গ্রন্থ তাঁর কল্পনাজগতকে প্রভাবিত করেছিল 1। তাঁর মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন সেকালের এক জন কৃতি লেখিকা, যাঁর লেখা কলকাতার বিভিন্ন অগ্রগণ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। মায়ের সাহিত্যপ্রীতি সিরাজের ভেতরে খুব অল্প বয়সেই সৃজনশীলতার বীজ বুনে দিয়েছিল। মাত্র নয়-দশ বছর বয়সেই তিনি ‘খোশবাসপুরের গুপ্তকথা’ নামে একটি কাহিনী লিখে ফেলেছিলেন 1।
শিক্ষা জীবনের সূচনায় সিরাজ প্রকৃতির টানে প্রায়শই ক্লাস ফাঁকি দিতেন। গোকর্ণ প্রসন্নময়ী হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি হিজল অঞ্চলের হিংস্র জনজীবন এবং বিচিত্র সব চরিত্র প্রত্যক্ষ করেন। বর্ধমানের কালনায় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় সাঁওতাল সহপাঠী কালিয়ার কাছে তাঁর বাঁশি শেখার ঘটনাটি পরবর্তী বোহেমিয়ান জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত ছিল 1। আইএ পড়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন, কিন্তু খুব দ্রুতই কবিতার জগতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কলকাতায় কয়েক মাস কাটিয়ে তিনি বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে-র মতো কবিদের সংস্পর্শে এলেও নিজের গন্তব্য খুঁজে পান গ্রামে ফিরে। ১৯৫০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের (IPTA) নির্দেশে ‘খোশবাসপুর আলকাপ দল’ গঠন করেন 1। প্রায় ছয় বছর তিনি ‘সিরাজ ওস্তাদ’ বা ‘সিরাজ মাস্টার’ নামে পরিচিত হয়ে রাঢ় বাংলার গ্রাম-প্রান্তরে মেলায়-হাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এই ছ-সাত বছরের ‘আশ্চর্য জীবন’ যেখানে আড়াই হাজার রাত বিনিদ্র কেটেছে, তাই ছিল তাঁর সাহিত্যের প্রধান রসদঘর। এই সময়েই তিনি মানুষের জীবনের আদিম প্রবৃত্তি, সৌন্দর্য ও যন্ত্রণা এবং মানুষের ভেতরের ‘অর্ধ-নারীশ্বর’ রূপকে খুব কাছ থেকে দেখেন 1।
দ্বিতীয় পর্যায়: কথাসাহিত্যে পদার্পণ ও আধুনিকতার সন্ধান (১৯৫৬-১৯৭৩)
সিরাজের জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ১৯৫৬ সালে হাসনে আরার সঙ্গে বিবাহের মাধ্যমে। স্ত্রীর সনির্বন্ধ অনুরোধেই তিনি আলকাপের জীবন ত্যাগ করে সিরিয়াস সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন 1। ১৯৫৮ সালে বহরমপুরের ‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামে তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘কাঁচি’ প্রকাশিত হয় 1। ‘ইবলিশ’ ছদ্মনাম ব্যবহারের পেছনে সিরাজের এক বিশেষ দার্শনিক অবস্থান ছিল—ইবলিশ মানে শয়তান, যে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং যে মাটির মানুষের কাছে মাথা নত করতে চায় না 1।
ষাটের দশকে যখন বাংলা সাহিত্যে ‘এই দশক’ বা ‘হাংরি জেনারেশন’-এর আন্দোলন চলছে, তখন সিরাজ গ্রামে বসেই ‘তরঙ্গিণীর চোখ’-এর মতো আধুনিক গল্পের বয়ন করছিলেন 1। ১৯৬২ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভালোবাসা ও ডাউনট্রেন’ তাঁর সাহিত্যিক পরিচিতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই সময়েই তিনি হুগলির পাণ্ডুয়া এবং পরে কলকাতায় থিতু হওয়ার লড়াই শুরু করেন। ১৯৭০ সালের দিকে তিনি পাকাপাকি ভাবে কলকাতার গোরাচাঁদ রোডে বসবাস শুরু করেন। এই পর্বেই তাঁর শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক উপন্যাস ‘তৃণভূমি’ (১৯৭০) এবং ‘হিজলকন্যা’ (১৯৬৭) প্রকাশিত হয় 1।
তৃতীয় পর্যায়: মহাকাব্যিক বিস্তার ও বিশ্বমানবিকতা (১৯৭৩-২০১২)
১৯৭৩ সালে ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করার পর সিরাজের সাহিত্যিক জীবনে এক নতুন স্থিতিশীলতা আসে। এই সময়েই তিনি তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘অলীক মানুষ’ (১৯৮৮) রচনা করেন, যা তাঁকে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এনে দেয় 2। সাংবাদিকতার পেশাগত চাপের মাঝেও তিনি ‘চতুরঙ্গ’ বা ‘ধ্বনি’-র মতো লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে লিখে গিয়েছেন 7। এই পর্বে তিনি কেবল আঞ্চলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকেননি, বরং তাঁর রচনায় আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস এবং দর্শনের এক জটিল সংমিশ্রণ ঘটেছে। শিশুদের জন্য ‘কর্নেল নীলাদ্রি সরকার’ চরিত্রটি সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন 2। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটলেও তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার আজও অম্লান।
ব্রাত্যজীবনের সংজ্ঞা এবং সিরাজের দৃষ্টিভঙ্গি
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সাহিত্যে ‘ব্রাত্য’ বা প্রান্তিক মানুষের যে ধারণা পাওয়া যায়, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট সামাজিক স্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের মতে, সিরাজের ব্রাত্যজগত হলো এমন এক জনগোষ্ঠী যারা শ্রেণি, জাতি, বর্ণ, পদমর্যাদা এবং পেশাগত অবস্থানের ভিত্তিতে অবহেলিত ও উপেক্ষিত 1। চর্যাপদ থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যে ব্রাত্যদের আনাগোনা থাকলেও সিরাজের কলমে তারা এক ভিন্নমাত্রায় মূর্ত হয়েছে। সিরাজ মনে করতেন, তথাকথিত অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত গ্রামীণ মানুষের হৃদয়াভ্যন্তরে যে রহস্য-কুটিল মানুষের বাস, তাকে শিল্পরূপ দান করাই কথাসাহিত্যিকের কাজ 1।
সিরাজের ব্রাত্যজনেরা করুণার পাত্র নয়, বরং তারা প্রচণ্ড জীবনীশক্তি সম্পন্ন। তাদের আনন্দ, উল্লাস, বিরহ, যাতনা, যৌনতা এবং বিদ্রোহী চেতনা নগর সংস্কৃতির মোড়কে বন্দি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ও জৈবিক 1। সিরাজের রচনায় ব্রাত্যদের উপস্থিতি প্রধানত দুটি ধারায় প্রবাহিত—একদিকে তাদের মানবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি, অন্যদিকে সমাজ-রাজনীতির নিষ্ঠুর আবর্তে তাদের পিষ্ট হওয়ার করুণ আখ্যান।
ব্রাত্যচরিত্রের শ্রেণীবিভাগ ও পেশাগত বৈচিত্র্য
সিরাজের রচনায় ব্রাত্যদের পেশাগত বৈচিত্র্য অত্যন্ত ব্যাপক। তিনি রাঢ় বাংলার সেই সব মানুষদের চরিত্র হিসেবে নির্বাচন করেছেন, যাদের কথা মূলধারার সাহিত্যে সচরাচর ব্রাত্য থাকে। নিম্নের সারণিতে তাঁর রচনার প্রধান কিছু ব্রাত্যচরিত্রের পেশা ও সামাজিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা হলো:
| পেশা / সামাজিক অবস্থান | উদাহরণ চরিত্র | সংশ্লিষ্ট কাহিনী | চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য |
| বাগাল (শিশু শ্রমিক) | হরিবোলা | বাগাল | মালিকের অত্যাচারে পিষ্ট, শৈশবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত 1। |
| মাঠকুড়ুনী / প্রান্তিক নারী | চিরুনী | অঘ্রানে অন্নের ঘ্রাণ | দারিদ্র্যের কারণে শোষণের শিকার, কিন্তু মানবিক আশ্রয়ের সন্ধানী 1। |
| ভূমিহীন খেতমজুর | ফৈজু, বাবরু | মাটি, সাড়ে চার হাত মাটি | মাটির প্রতি গভীর টান থাকলেও ভূমিদস্যুদের কাছে পরাজিত 1। |
| চৌকিদার / অনাথের আশ্রয় | বিপিন | পেছনে পায়ের শব্দ | অভাবের মধ্যেও পিতৃত্বের মমত্ববোধ সম্পন্ন 1। |
| আলকাপ শিল্পী (ছোকরা) | সুবর্ণ | মায়ামৃদঙ্গ | লিঙ্গ-পরিচয় ও অস্তিত্বের সংকটে দোদুল্যমান 10। |
| মুচি-বায়েন / আদিম জীবন | তরঙ্গিণী | তরঙ্গিণীর চোখ | ভাগাড়ের মৃত পশুর চামড়া ও মাংসের ওপর নির্ভরশীল জীবন 1। |
ছোটগল্পের দর্পণে ব্রাত্যজীবন: এক সমাজতাত্ত্বিক পাঠ
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ছোটগল্পগুলোতে ব্রাত্যজীবনের দ্বন্দ্বমধুর কাহিনী যেভাবে উঠে এসেছে, তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি রাঢ়ের রুক্ষ-কর্কশ আবহাওয়ায় জারিত মানুষের ভেতরের আদিম প্রাণিজ সত্তার দাপাদাপিকে শিল্পের বিষয় করেছেন 1।
মানবিকতা ও অস্তিত্বের লড়াই
ব্রাত্য মানেই কেবল অন্ধকার নয়, সিরাজ দেখিয়েছেন চরম অভাবের মাঝেও মানুষের মানবিক প্রবৃত্তিগুলো কীভাবে টিকে থাকে। ‘গোঘ্ন’ গল্পটি সিরাজের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এখানে হারাই নামক এক প্রান্তিক চাষির পশুপ্রেম পিতৃত্বের উচ্চতায় পৌঁছেছে। তার কাছে তার হালের বলদ ‘ধনা-মনা’ কেবল চাষের উপকরণ নয়, বরং তারা তার সন্তানতুল্য। যখন দারিদ্র্যের কারণে অসুস্থ ধনাকে বিক্রি করতে হয়, তখন তার মাংস হারাইয়ের কাছে ‘হারাম’ হয়ে ওঠে। এই গল্পের মাধ্যমে সিরাজ সাবাল্টার্ন বা নিম্নবর্গীয় চেতনার এক গভীর সংকটের দিক উন্মোচন করেছেন—যেখানে উচ্চবর্গের বদর হাজিরা হারাইয়ের এই আত্মিক ট্র্যাজেডি বুঝতে ব্যর্থ হয় 1।
অনুরূপভাবে ‘পেছনে পায়ের শব্দ’ গল্পে বিপিন চৌকিদারের মহানুভবতা আমাদের সচকিত করে। অনাথ গোবরার প্রতি তার যে পিতৃসুলভ আচরণ, তা আসলে সমাজের প্রান্তিক মানুষের অন্তর্গত ভালোবাসারই প্রকাশ। নিজের অভাবের কারণে সে গোবরাকে ঘরে আনতে পারে না, কিন্তু সারা জীবন তার কানে সেই ছোট্ট পায়ের শব্দ বেজে চলে 1।
রাজনীতির করাল গ্রাস ও ভূমিহীন মানুষ
ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ রাজনীতিতে যে আমূল পরিবর্তন এসেছিল, সিরাজ তাঁর গল্পে সেই বিবর্তনকে নিখুঁতভাবে ধরেছেন। ‘মাটি’ এবং ‘সাড়ে চার হাত মাটি’ গল্প দুটি ভূমিহীন মানুষের বঞ্চনার ইতিহাসের দলিলে পরিণত হয়েছে। ‘মাটি’ গল্পের ফৈজু জমি পেয়েও তা রক্ষা করতে পারে না, কারণ কানুহরি মোক্তারের মতো ধুরন্ধর শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো শক্তি তার নেই 1। ‘সাড়ে চার হাত মাটি’ গল্পে বাবরু নামক এক কৃষকের মাটির প্রতি যে আদিম টান, তা এক ট্র্যাজিক পরিণতি পায়। ভিটেমাটি হারানোর পর সে শেষ পর্যন্ত নিজের কবরের জন্য নির্দিষ্ট সাড়ে চার হাত জমিও পায় না 1।
সিরাজ দেখিয়েছেন যে, রাজনীতির এই মরণজালে কেবল সচ্ছল মানুষেরাই নয়, বরং অতি দরিদ্র ব্রাত্যজনদেরও জড়িয়ে পড়তে হয়। ‘অক্রূরের গল্প’ বা ‘ছবির মানুষ’ গল্পগুলোতে দেখা যায়, কীভাবে গ্রামীণ রাজনীতির নব্য এলিটরা সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। সিরাজের ভাষায়, রাজনীতির এই খেলা অনেক সময় ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে 12।
আদিম প্রবৃত্তি ও প্রতিহিংসার রূপায়ণ
ব্রাত্যজীবনের আর একটি দিক হলো তাদের ভেতরের অদম্য কামনা এবং বিধ্বংসী প্রতিহিংসা। সিরাজের রচনায় গ্রামের মানুষ মানেই কেবল সরলতা নয়, বরং সেখানে রয়েছে জটিল মানস-সত্তা। ‘সোনালি মোরগের গল্প’-এ শৈল নামক এক নারীর প্রতিহিংসার আগুন পুরো গ্রামকে জ্বালিয়ে দেয়। প্রেমের প্রত্যাখ্যান কীভাবে এক জন প্রান্তিক মানুষকে নিষ্ঠুর ও বিধ্বংসী করে তুলতে পারে, তার পরিচয় এই গল্পে মেলে 1। একইভাবে ‘বৃষ্টিরাতের আগন্তুক’ গল্পে দীপিতার নিষ্ঠুর আচরণ প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা মরে গেলে মানুষ পাথরের মতো কঠোর হয়ে ওঠে 1।
উপন্যাসের মহাকাব্যিক ক্যানভাস: অলীক মানুষ ও ব্রাত্যজনের আধ্যাত্মিকতা
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসটিকে কেবল একটি পীর পরিবারের কাহিনী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি জনগোষ্ঠীর বিবর্তন এবং মানুষের আদিম বিশ্বাসের সাথে আধুনিকতার সংঘাতের ইতিহাস 13। এই উপন্যাসে ব্রাত্যদের উপস্থিতি তাদের ধর্মীয় ও লৌকিক বিশ্বাসের স্তরে।
বদিউজ্জামান বা বদু পীর চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ সমাজ ও ভক্তদের চাপে ‘অলীক মানুষ’ বা মিথের মূর্তিতে পরিণত হয়। বদিউজ্জামানের নিঃসঙ্গতা হলো আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে পৌঁছানোর যন্ত্রণা, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ সাধারণ মানুষের কাছে অদৃশ্য হয়ে যায় 13। অন্যদিকে তাঁর পুত্র শফিউজ্জামানের বিদ্রোহী চেতনা এবং ক্রমশ নিষ্ঠুরতায় রূপান্তর আসলে মানুষের অন্তর্গত সত্যকে খোঁজারই এক স্বেচ্ছাচারী প্রয়াস। ১৯ ও ২০ শতকের মুসলমান সমাজের পটপরিবর্তন এবং পীর-ফকিরদের বিচিত্র জগতকে সিরাজ এখানে এক মায়াবী বাস্তবতার (Magical Realism) প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন 13।
মায়ামৃদঙ্গ: লোকনাট্য এবং লিঙ্গ-পরিচয়ের ব্রাত্যভূমি
আলকাপ লোকনাট্যকে কেন্দ্র করে রচিত ‘মায়ামৃদঙ্গ’ (১৯৭২) সিরাজের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার এক অনন্য ফসল। তিনি নিজে আলকাপের ওস্তাদ ছিলেন বলেই এই জগতের অন্ধকার ও আলোর খেলাকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে চিত্রিত করতে পেরেছেন 11। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ‘ছোকরা’ বা নারীবেশী পুরুষ অভিনেতাদের জীবন।
সুবর্ণ নামক এক চনমনে ছোকরার মাধ্যমে সিরাজ লিঙ্গ-পরিচয়ের (Gender Identity) এক গভীর দর্শনকে স্পর্শ করেছেন। হ্যাজাগের আলোয় যখন সুবর্ণ নাচে, তখন সে আর পুরুষ থাকে না, বরং সে হয়ে ওঠে এক মায়াবী কিন্নরী। এই রূপান্তর কেবল অভিনয়ের স্তরে থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বের এক সংকট 10। আলকাপের ওস্তাদ ও অভিনেতারা কীভাবে এই ছোকরাদের দেহের মায়ায় বন্দি হয় এবং পরবর্তী সময়ে যৌবনের অবসান ঘটলে সেই মায়া কীভাবে ভেঙে যায়, তার এক হাহাকারময় রূপ এই উপন্যাসে পাওয়া যায় 11। আধুনিক কুইয়ার থিওরি (Queer Theory) আসার বহু আগেই সিরাজ এই প্রান্তিক জীবনের জটিল মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন 10।
রাঢ়ের মাটি ও মানুষ: তারাশঙ্কর ও সিরাজের তুলনা
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজকে প্রায়শই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। রাঢ় বাংলার রুক্ষ মাটি, আদিম প্রবৃত্তি এবং সামন্ততান্ত্রিক অবক্ষয়ের চিত্রায়ণে তারাশঙ্করের যে মুন্সিয়ানা ছিল, সিরাজ তাকে আধুনিক সমাজ-দর্শনের প্রেক্ষাপটে নতুন রূপ দান করেছেন 7। তারাশঙ্কর নিজেই একদা বলেছিলেন, “আমার পরেই সিরাজ, সিরাজই আমার পরে অধিষ্ঠান করবে” 7।
তবে উভয়ের ব্রাত্যজন চিত্রায়ণে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। তারাশঙ্করের প্রান্তিক মানুষেরা অনেক সময় ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে অথবা তপোবনের ঐতিহ্যে লীন হতে চায়। কিন্তু সিরাজের মানুষেরা অনেক বেশি বাস্তববাদী এবং তারা আধুনিক রাজনীতির জটিলতাকে ধারণ করে। তারাশঙ্কর যেখানে আঞ্চলিকতার সোঁদা গন্ধে বিভোর থাকেন, সিরাজ সেখানে মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তিকে বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন 7। সিরাজের গদ্য অনেক বেশি সংহত এবং তাতে বিদ্রূপ ও নির্লিপ্তির এক অদ্ভুত মিশেল পাওয়া যায়।
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকর্মের মিথস্ক্রিয়া
দীর্ঘদিন ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজে যুক্ত থাকা সিরাজের লেখকসত্তাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তিনি কেবল খবরের কাগজ সম্পাদনা করেননি, বরং সাংবাদিকতার সূত্রে তিনি বাংলার দূরদূরান্তের মানুষের জীবনের প্রকৃত সত্যকে অনুসন্ধান করেছেন 4। তিনি মনে করতেন, সৎ সাহিত্যিকের কাজ হলো ইতিহাসের সেই মানুষকে খুঁজে বের করা যে প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস তৈরি করছে 8।
সিরাজ তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলো ‘চতুরঙ্গ’ বা ‘ধ্বনি’-র মতো লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বড় সংবাদপত্রে কাজ করলেও তিনি কোনো মালিকানাগোষ্ঠীর কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর আত্মসম্মানবোধ এবং পাঠকদের সাথে গভীর আত্মিক সম্পর্ক তাঁকে সমসাময়িক অন্য লেখকদের থেকে আলাদা করে রাখে 7। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাঁকে তথ্যনিষ্ঠ হতে শিখিয়েছিল, কিন্তু তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা সেই তথ্যকে ছাপিয়ে এক চিরকালীন সত্যের জন্ম দিয়েছে।
উপসংহার: অমরত্বের পথে এক ব্রাত্য কথাকার
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের সাহিত্য কেবল রাঢ় বাংলার আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তা মানুষের অস্তিত্বের এক গভীরতম পাঠ। তাঁর রচনায় ব্রাত্যজনদের উপস্থিতি কেবল সামাজিক দায়িত্ব পালন নয়, বরং তা লেখকের নিজস্ব সত্তারই এক প্রতিফলন। আলকাপের ওস্তাদ থেকে শুরু করে আনন্দবাজারের সাংবাদিক—এই বিচিত্র পথচলায় তিনি বারবার ফিরে গিয়েছেন সেই সব মানুষের কাছে যারা তথাকথিত সভ্যতার আলো থেকে দূরে থেকেও প্রাণের স্পন্দনে অনন্য।
সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ যেমন আধ্যাত্মিকতার রহস্যে ঘেরা, তেমনই তাঁর ‘মায়ামৃদঙ্গ’ লোকনাট্যের বিচিত্র মায়াজালে আবদ্ধ। তাঁর ছোটগল্পগুলো মানুষের প্রবৃত্তি, রাজনীতি এবং মানবিকতার এক আশ্চর্য খসড়া। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এক জিয়নকাঠি হয়ে থাকবেন, যাঁর কলম বারবার প্রমাণ করেছে যে মানুষের ভেতরের ‘প্রান্তিকতা’ আসলে এক বিশাল আকাশের হাতছানি। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায় যে, মাটির গভীরে যেমন শেকড় থাকে, তেমনই সেই মাটিই মানুষকে মুক্তির আস্বাদ দেয়। রাঢ় বাংলার রুক্ষ মাটি থেকে উঠে আসা এই কথাকার প্রকৃতপক্ষে এক বিশ্ব-নাগরিক, যাঁর ব্রাত্যজন-চেতনা বাংলা সাহিত্যের এক চিরকালীন সম্পদ।
তাঁর সৃষ্ট চরিত্র হারাই, ফৈজু, সুবর্ণ বা বাবরুরা আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, আর আমরা অনুভব করি সিরাজের সেই অমর উক্তি—”সাহিত্য তো বাস্তব জীবনের একটি নতুন রূপ।” এই নতুন রূপ সৃষ্টির লগ্নই সিরাজকে অমরতা দান করেছে। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর অগণিত ব্রাত্যজনদের নিয়ে এক নিঃসঙ্গ সম্রাট হিসেবেই বিরাজ করবেন।
Works cited
- ফাইনাল.docx
- মায়ামৃদঙ্গ by Syed Mustafa Siraj – Goodreads, accessed on May 8, 2026, https://www.goodreads.com/book/show/29748452
- আলকাপে ‘ওস্তাদ’ ছিলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – Anandabazar, accessed on May 8, 2026, https://www.anandabazar.com/west-bengal/article-on-syed-mustafa-siraj-1.873718
- An online e-Library: সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – Bangla Classic Books, accessed on May 8, 2026, https://banglaclassicbooks.blogspot.com/p/blog-page_34.html
- তৃণভূমি ও সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – কালি ও কলম, accessed on May 8, 2026, https://www.kaliokalam.com/%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%A3%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%AE%E0%A6%BF-%E0%A6%93-%E0%A6%B8%E0%A7%88%E0%A7%9F%E0%A6%A6-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%BE-%E0%A6%B8/
- অলীক মানুষ by Syed Mustafa Siraj – Goodreads, accessed on May 8, 2026, https://www.goodreads.com/book/show/18051901
- সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – উইকিপিডিয়া, accessed on May 8, 2026, https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B8%E0%A7%88%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%A6_%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%BE_%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C
- সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার: বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের ‘কলকাতা জ্বর’ কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে হবে, accessed on May 8, 2026, https://bangla.bdnews24.com/arts/24114
- ব্যতিক্রমী জীবনের কথাশিল্পী সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – কালি ও কলম, accessed on May 8, 2026, https://www.kaliokalam.com/%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A7%80-%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%B2/
- Making women out of men: Mystifying queer desires, staging queerness in Siraj’s Māyā Mridanga – Tarshi, accessed on May 8, 2026, https://www.tarshi.net/inplainspeak/review-making-women-men-mystifying-queer-desires-staging-queerness-sirajsmayamridanga/
- (PDF) সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের মায়ামৃদঙ্গ : মৃদঙ্গ দোলায় কিন্নরী-মন, accessed on May 8, 2026, https://www.researchgate.net/publication/394416698_saiyada_mustapha_sirajera_mayamrdanga_mrdanga_dolaya_kinnari-mana
- সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ছোটগল্প : গ্রামীণ রাজনীতি – মোঃ আলাউদ্দিন, accessed on May 8, 2026, https://www.thecho.in/files/6.————–.pdf
- অলীক মানুষ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – Amarboi.com, accessed on May 8, 2026, https://www.amarboi.com/2015/08/alik-manush-syed-mustafa-siraj.html
- Reading Magical Realism Intertwined in the Social Fabric of Alik Manus or Mythical Man by Syed Mustafa Siraj INTRODUCTION The, accessed on May 8, 2026, https://www.agathos-international-review.com/issues/2021/23/Chakraborty.pdf
- সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ – Vikaspedia – Education, accessed on May 8, 2026, https://education.vikaspedia.in/viewcontent/education/9b69bf9b69c1-9859999cd9979a8/9ac9be9829b29be9b0-9b69cd9b09c79b79cd9a0-9b89be9b99bf9a49cd9af9bf9959a69c79b0-99c9c09ac9a89c0/9b89c89af9bc9a6-9ae9c19b89cd9a49be9ab9be-9b89bf9b09be99c?lgn=bn
- সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অজ্ঞাতবাস – কালি ও কলম, accessed on May 8, 2026, https://www.kaliokalam.com/%E0%A6%B8%E0%A7%88%E0%A7%9F%E0%A6%A6-%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AB%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%9C/

