মাইকেল মধুসূদন দত্তের “হেক্টরবধ” অনুবাদধর্মী গ্রন্থ। গ্রিক মহাকবি হোমারের “ইলিয়াড/ইলিয়াস” কাব্যের কাহিনী সংক্ষিপ্তাকারে পরিবেশন করা কবির ইচ্ছা ছিল। মূল কাব্যের হুবহু অনুবাদ তিনি করতে চাননি –

[ads id=”ads1″]

“আমি কবিগুরুর মহাকাব্যের অবিকল অনুবাদ করি নাই। তাহা করিতে হইলে অনেক পরিশ্রম হইত। বিদেশি একখানি কাব্য দত্তক পুত্ররূপে গ্রহণ করিয়া আপন গোত্রে আনা বড় সহজ ব্যাপার নহে। কারণ তাহার মানসিক ও শারীরিক ক্ষেত্র হইতে বংশের চিহ্ন ও ভাব দূরীভূত করিতে হয়। এ দূরূহ যে আমি কতদূর পর্যন্ত কৃতকার্য হইয়াছি তাহা বলিতে পারি না।” (উৎসর্গপত্র/ হেক্টরবধ) 

যাই হোক, মূলকাব্যের প্রথম ১২টি সর্গের কাহিনি যথাসম্ভব স্বল্প পরিসরে মোট ৬টি পরিচ্ছেদে গদ্যভঙ্গীতে বলবার চেষ্টা করেছেন কবি। অপর ১২টি সর্গের কাহিনী আর বলা সম্ভব হয়নি। “THE TALE OF TROY DEVINE” অর্থাৎ ট্রয় যুদ্ধের ইতিহাস ও কাহিনী অবলম্বনে গ্রন্থটি রচিত হয়েছে। ট্রয় রাজকুমার মহাবীর হেক্টরের মৃত্যু এ গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
কবির উৎসর্গপত্র পড়ে জানা যায়, ১৮৬৭ সাল থেকে এটি লিখতে কবি শুরু করেছিলেন। কিন্তু ৬টি পরিচ্ছেদ লেখবার পরে আর লেখার তাগিদ অনুভব করেননি। কবির মনের সেরূপ অবস্থা তখন ছিল না। চার বছর পর অসমাপ্ত অবস্থাতেই গ্রন্থকারে কাব্যটি ১৮৭১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় । মধুসূদনের জীবদ্দশায় কাব্যটির একটিমাত্র সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ১০৫টি। কবি এই কাব্যটি তাঁর সহপাঠী এবং বাল্যবন্ধু শ্রীভূদেব মুখোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করেন। গ্রন্থটি উপহার পেয়ে ভূদেববাবু চুঁচুড়া থেকে কবিকে পত্র লিখে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন (২৮শে মার্চ, ১৮৭২) , পরে সেই পত্রটি ২৬শে এপ্রিল “এডুকেশন গেজেট” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ।
শেষ পর্যন্ত এ কাব্যের কিছু দোষ ত্রুটি অবশ্যই থেকে গেছে। গদ্যরচনা মধুসূদনের প্রতিভার সবিশেষ উপযোগী ছিল না। এ গ্রন্থের ভাষা ব্যাকরণদুষ্ট, গ্রাম্যতাপূর্ণ এবং আদ্যোপান্ত পাশ্চাত্যভাবানুপ্রাণিত বলে ইংরেজি অনভিজ্ঞ পাঠকের কাছে তা দুর্বোধ্য ঠেকে। “পান্ডুগণ্ডশঙ্কা”, “পিত্তলপদ”, “ভূককম্পকারাজলদলপতি” ইত্যাদি শব্দ সাধারণ পাঠকের বোধগম্যসীমার অতীত। অনেকের মতে মধুসূদন শেষ পর্যন্ত এ গ্রন্থ অন্যান্য অসম্পূর্ণ রচনার মতোই প্রকাশ না করলেই ভালো করতেন বলে মনে করেছেন ।
[ads id=”ads2″]

আরো পড়ুন :  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দুর্গাপূজা, লিখেছেন অরিন্দম ঘোষাল

“যিনি মেঘনাদবধকাব্য রচনা করিয়াছিলেন, অলংকার সমন্বিত গদ্যরচনায় হেক্টরবধ তাহার হাতে খড়ি। আর হাতেখড়িতেই তাহার গদ্যরচনার চিরাবসান হইয়াছে।” (মধু-স্মৃতি / নগেন্দ্রনাথ সোম) 

সুতরাং হেক্টরবধ মধুসূদনের গোধূলিবেলার অস্তমিত শক্তির অন্যতম শেষ নিদর্শন এবং জীবদ্দশায় মুদ্রিত ও প্রকাশিত শেষ গ্রন্থ।
—————————————————
লেখক — প্রীতম চক্রবর্তী  

——————————————————–


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *